বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার মানবাধিকারেরই অংশ

এক সময় বলা হত – পানির অপর নাম জীবন৷ এখন এই কথাটিই একটু ঘুরিয়ে বলতে হচ্ছে, ‘বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন আর দূষিত পানির অপর নাম মরণ’৷

বিশুদ্ধ পানি পারে জীবন বাঁচাতে সারা বিশ্বে কয়েক কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ সবাই যেন বিশুদ্ধ পানি পায়, ব্যবহার করতে পারে সেই লক্ষ্যে জাতিসংঘ একটি খসড়া প্রস্তাব পাশ করেছে সম্প্রতি৷ এই পৃথিবীতে যত মানুষ এইডস, ম্যালেরিয়া এবং হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ প্রাণ হারায় দূষিত পানি ব্যবহার এবং পান করে৷ পানি ছাড়া একদিনও চলা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়৷ যে সব দেশে বিশুদ্ধ পানির অভাব সেসব দেশের মানুষ তাই বাধ্য হয়েই দূষিত পানি ব্যবহার করছে৷ প্রতিটি মানুষের অধিকার রয়েছে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করার, পান করার৷ পরিষ্কার এবং বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার মানবাধিকারেরই একটি অংশ – স্পষ্টভাবেই কথাগুলো জানিয়েছে জাতিসংঘ৷ সেই লক্ষ্যে জাতিসংঘ সম্প্রতি একটি খসড়া প্রস্তাব পাশ করেছে৷ তাতে সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ রয়েছে – পরিষ্কার পানি পাওয়ার অধিকার প্রতিটি মানুষের রয়েছে৷

বিশুদ্ধ খাবার পানি পাওয়া এখন মানবাধিকার : গত বুধবার হঠাৎ করেই এই খসড়া প্রস্তাবের কথা উঠে৷ তবে বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার মানবাধিকার কিনা তা নিয়ে জাতিসংঘের বেশ কিছু সদস্যদেশ প্রশ্ন তুলেছে৷ যেসব দেশ প্রশ্ন তুলেছে, বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সেই দেশগুলো প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেনি৷ সে দেশগুলোর মধ্যে অ্যামেরিকা, ক্যানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া উল্লেখযোগ্য৷ তবে এই খসড়া প্রস্তাব পাশের পেছনে রয়েছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো৷ এর মূল কারণ হল তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই মানুষ বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত৷ জার্মানি, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, স্পেন এবং ব্রাজিল অবশ্য খসড়া প্রস্তাবের পক্ষে ছিল৷

উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় একশ কোটি মানুষ পরিষ্কার বা খাবার পানি পাচ্ছে না৷ ফলে প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে নানা ধরণের অসুখে ভুগে মারা যাচ্ছে৷ এই কথাগুলো জানিয়েছে ইউনিসেফ৷ সংস্থাটি আরো বলেছে, দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং মারাও যাচ্ছে৷ এর সঙ্গে রয়েছে অস্বাস্থ্যকর এবং খোলা টয়লেট ব্যবহার৷ এসব টয়লেটেও পানির কোন ব্যবস্থা নেই৷ প্রতিদিনই পানির জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের মানুষরা৷

জাতিসংঘে জার্মানির দূত পেটার ভিটিশ এই খসড়া প্রস্তাব প্রসঙ্গে জানান, ‘যে সব দেশ বিশ্বাস করে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারের অধিকার প্রতিটি মানুষের আছে – জার্মানি তাদের অন্যতম৷ আমরা মনে করি বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার, স্বাস্থ্য-সুরক্ষার জন্য টয়লেট ব্যবহার মানবাধিকারেরই একটি অংশ৷

ঠিক একথাগুলোই উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৬৬ সালের অঙ্গীকারপত্রে৷ এই অঙ্গীকারপত্র অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সংস্কৃতিক অধিকারের কথা বলে৷ ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে উন্নত জীবন যাত্রার মান নিশ্চিত করা হয়েছে৷ সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে বিশুদ্ধ পানির ব্যবহারের কথা৷’

খসড়া প্রস্তাব পাশের পক্ষে জাতিসংঘের ১২২টি দেশ ভোট দিয়েছে৷বলা হয়েছে, ‘বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার মানবাধিকারের অংশ’৷ বন শহরে জাতিসংঘের দপ্তর ইউএন ওয়াটার-এ কাজ করছেন অ্যালিস ফিশার৷ ঠিক কোন দেশগুলোতে পানির অভাব এবং কোন দেশগুলো পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি ?

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বে প্রায় ৯০ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ এছাড়া প্রায় ২৬০ কোটি মানুষ অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহার করছে– অর্থাৎ টয়লেটগুলো একেবারে খোলা,উন্মুক্ত৷ জীবাণু আশেপাশে খুব সহজে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে৷ প্রতি বছর অন্তত পনের লক্ষ শিশু দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে মৃত্যু বরণ করছে৷’

অ্যালিস ফিশার জানান, সারা বিশ্বে যত পানি রয়েছে তার মাত্র ১.৪ শতাংশ ব্যবহারযোগ্য৷ উদাহরণস্বরূপ তিনি মেক্সিকো সিটির কথা বলেন৷ সেখানে ২২ কোটি মানুষ বসবাস করে৷ তাদের পানির একমাত্র উৎস হচ্ছে গ্রাউন্ড ওয়াটার বা ভূ-গর্ভস্থ পানি৷ এই পানি আসে মেক্সিকো ভ্যালি থেকে৷ অ্যালিস ফিশার আফ্রিকায় দূষিত পানি ব্যবহার প্রসঙ্গে জানান, ‘আফ্রিকায় ৯৭ এবং ৯৮ সালে কলেরার প্রাদুর্ভাব আমরা লক্ষ্য করেছি – এর মূলে ছিল দূষিত পানি৷ কেনিয়া, তানজানিয়া এবং উগান্ডায়ও একই ধরণের সমস্যা আমরা দেখেছি৷’

প্রতিবেদন: মারিনা জোয়ারদার, সম্পাদনা: আবদুল্লাহ আল-ফারূক। সুত্র : dw

mm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *