স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশুরা: প্রয়োজন নিরাপদ পানি ও উন্নত স্যানিটেশন

দেশের অন্তত দুই কোটি শিশু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে এবং প্রতি বছর তারা কোনো না কোনোভাবে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডের মতো মারাত্মক জীবাণুবাহিত রোগে ভুগছে। মূলত দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহারই বিপুলসংখ্যক শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম কারণ, যা থেকে পরিত্রাণের উপায় খোঁজা জরুরি।

ইউনিসেফ পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, প্রায় দুই কোটি শিশু তাদের স্কুলে স্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহার করতে পারে না। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়িঘরে বাবা-মায়ের সচেতনতায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিধিবিধান মানলেও সাধারণত স্কুলে শিশুরা হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে একেবারেই উদাসীন থাকে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যকর টয়লেট না থাকায় সেখানে সহজেই শিশুরা জীবাণু সংক্রমণের শিকার হচ্ছে। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে রয়েছে পানিজনিত সমস্যা।

গত মে মাসে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্তৃক হাইকোর্টে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে রাজধানীর ৫৯টি এলাকার পানি বেশি দূষিত বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবতা হল, উল্লিখিত তালিকার বাইরে আরও অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ‘প্রমিজিং প্রগ্রেস : অ্যা ডায়াগনস্টিক অব ওয়াটার সাপ্লাই, স্যানিটেশন, হাইজিন অ্যান্ড প্রভার্টি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বাংলাদেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানির ৮০ শতাংশেই ডায়রিয়ার জীবাণুর (ই-কোলাই) উপস্থিতি রয়েছে। দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় এলেও উদ্বেগের বিষয় হল, অনিরাপদ পানির কারণে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতায় মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপ বাড়ছে এবং এর ফলে নষ্ট হচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।

দূষিত পানির সংকট মোকাবেলায় আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে আমরা যে বিকল্প উৎসের সন্ধান করব, তারও উপায় নেই। দেশে বোতলজাত ও কনটেইনারে সরবরাহকৃত বিশুদ্ধ পানির নামে ভোক্তাদের সঙ্গে ভয়াবহ প্রতারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া বোতলজাত পানি কিনে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে সক্ষম কতজন, এটাও প্রশ্ন বটে! রাজধানীসহ সারা দেশে মিনারেল ওয়াটারের নামে যেসব বোতলজাত পানি বিক্রি হচ্ছে, দু-একটি বাদে তার অধিকাংশই মানসম্মত নয়।

দেশে বাজারজাতকৃত অধিকাংশ বোতল, কনটেইনার ও প্লাস্টিক প্যাকেটের পানিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত আয়রন, পিএইচ, ক্লোরিন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম নেই বললেই চলে; বরং এসব পানিতে লেড, ক্যাডমিমাম, কলিফর্ম ও জিংকের অস্তিত্ব রয়েছে। ক্যাডমিমামযুক্ত পানি নিয়মিত পান করলে শরীরে পুষ্টির অসমতা দেখা দিতে পারে এবং মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে।

কিছুদিন আগে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ‘আরবানাইজেশন অ্যান্ড মাইগ্রেশন ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে- বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ পূর্বাঞ্চলীয় শহরগুলোয় ভিড় জমাচ্ছে। এর ফলে নিরাপদ পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে এবং সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতায় শুধু স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপই বৃদ্ধি পায় না; এর ফলে মানুষের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বিনষ্ট হয়। এ প্রেক্ষাপটে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। এটি নিশ্চিত করা গেলে আমাদের শিশুরা নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রেহাই পাবে।

সৌজন্যেঃ দৈনিক যুগান্তর

mm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *