পানি নিয়ে ভাবনা বাড়ছে, বাড়ছে ব্যবসাও

হাইড্রোজেনের দুটি আর অক্সিজেনের একটি পরমাণু মিলে হয় পানি (H2O)| প্রাণের জন্য সবচেয়ে জরুরি এ উপাদানের জোগান কিন্তু ল্যাবরেটরি থেকে আসে না। বিশ্বের পানির চাহিদা মিটছে প্রাকৃতিক উৎস থেকে। পানির স্বাভাবিক উৎসগুলো দূষিত হয়ে পড়ায় নিরাপদ সুপেয় পানি দুর্লভ হয়ে পড়ছে। ফলে নাগরিকের জন্য কম খরচে ভালো পানি নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।
নিরাপদ পানি ক্রমেই হয়ে পড়ছে বাণিজ্যিক পণ্য। বিশ্বজুড়ে বোতলজাত পানির বিপণন বাড়ছে। বড় হচ্ছে পরিশোধনসামগ্রী ও পানি ব্যবস্থাপনার নানা প্রযুক্তির ব্যবসা। পানি খাতে অর্থায়নের জন্যও এক পায়ে দাঁড়ানো অনেক বৈশ্বিক ব্যাংক। পানির পেছনে ব্যয় বাড়ছে ব্যক্তির, পরিবারের, রাষ্ট্রের। বাণিজ্যিকীকরণের নানা আয়োজনের মধ্যেই জাতিসংঘ প্রস্তাব পাস করে বলেছে, পরিষ্কার পানীয় জল অন্যতম মানবাধিকার। রাষ্ট্র যাতে এই অধিকার নিশ্চিত করে, সে জন্য এটিকে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টতেও রাখা হয়েছে।


যতই পণ্য বানানোর চেষ্টা হোক, পানির মতো সংবেদনশীল সেবা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক যেকোনো সরকার। মুক্ত অর্থনীতির উন্নত দেশের মানুষও চায়, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা রাষ্ট্রের, অর্থাৎ স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকুক। খরচ বেশি পড়ায় বেসরকারি খাত থেকে পানি সরবরাহ সরকারি খাতে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে। পানির অর্থনীতি যুক্তরাজ্যে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ১৯৮৯ সাল থেকে বেসরকারি খাতে। ৯টি কম্পানির হাতে দেশটির পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। গ্রিনউইচ ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেসরকারীকরণের কারণে গ্রাহকরা বছরে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো বেশি খরচ করছে পানির পেছনে। পরিবারপ্রতি বছরে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ১০০ পাউন্ড। ২০১১ সালে খানাপ্রতি পানির বিল ছিল বছরে ৩৫৬ পাউন্ড, এখন তা ৪০০ পাউন্ড। আর ১৯৮৯ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে পানির দাম ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

প্যারিসের Sorbonne University-এর অর্থনীতিবিদদের হিসাবে প্যারিসে বেসরকারি খাতে সরবরাহ করা পানির দাম পৌরসভার পানির চেয়ে ১৬.৬ শতাংশ বেশি। গত বছরের আগস্টে চায়না ডায়ালগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারীকরণ ব্যর্থ হওয়ায় অনেক শহরে পানিব্যবস্থা সরকারি খাতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের শহরগুলোর ২৭ শতাংশ বাড়িতে পাইপলাইনের পানি যায় না। পানির সরবরাহে ঘাটতির সুযোগে মুনাফার পথ খুলেছে অনেকের। ভিওলিয়া ও সুয়েজের মতো বড় বড় কম্পানির কাছে পানি ও পয়োনিষ্কাশন এখন জমজমাট ব্যবসা। এতে চোখ পড়েছে বড় বড় ব্যাংকেরও। পানিশিল্পে বিনিয়োগের জন্য তহবিল আলাদা করে রাখছে তারা। সিটি গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ উইলেম বুটারের চোখে পানির গুরুত্ব একসময় তেল, তামা ও দামি ধাতুকেও ছাড়িয়ে যাবে।
ইউরোপে ইংল্যান্ডেই প্রথম পানি সরবরাহ বেসরকারীকরণ করা হয় ১৯৮৯ সালে। এটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক লেগেই আছে। বেসরকারি খাতে ছাড়ার শর্তে উন্নয়নশীল দেশে পানি খাতে ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। সরকারি খাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থার দোহাই দিয়ে বলিভিয়ার পানি খাতে ১৯৯৯ সালে ঢুকেছিল বিশ্বব্যাংক। বেসরকারীকরণের ফল হয়েছে উল্টো। ইংল্যান্ডে ১৯৮৯ সালের পর পানির দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ।


পানি খাতে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিনিয়োগ বেড়েছে। নিম্ন আয়ের দেশের বেড়েছে ১৮ শতাংশ। চীনে বেড়েছে ৫০ শতাংশ। বেসরকারি খাতে দিলেও পানি খাতে ঋণের গ্যারান্টি দিতে হয় সরকারকেই।
যুক্তরাজ্যের অধিকার সংগঠন (প্রেসার গ্রুপ) ‘উই ওন ইট’-এর চিফ ক্যাম্পেইনার এরেন লি বলেন, সরকারি খাতে পানি সরবরাহের দাবি উঠেছে। যুক্তরাজ্যের ৮৩ শতাংশ মানুষ চায় জাতীয়করণ।
নেদারল্যান্ডসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ চায় ভালো মানের পানি কম দামে পেতে। ২৬৬টি শহরে কম্পানি থেকে আবারও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা পৌরসভায় ফিরেছে পানি সরবরাহ। জাতীয়করণের চেয়ে এ ব্যবস্থাই পছন্দ অনেক দেশে। কারণ এতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্বাধীনতা থাকে, স্থানীয় মানুষেরও কিছুটা অংশগ্রহণ থাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে। প্যারিসের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভিওলিয়া ও সুয়েজ থেকে ফেরত নেওয়া হয়েছে ২০০৮ সালে। এখন বোর্ডে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব আছে।


যুক্তরাজ্যে বেসরকারি খাত থেকে পানি সরকারি খাতে আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। প্যারিস ও বার্লিনে বেসরকারি খাত থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। পাশের শহরের পৌরসভার চেয়ে বার্সেলোনায় কম্পানির পানির দাম ৯২ শতাংশ বেশি—এমন অভিযোগ তুলে পানি সরবরাহ নগর কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে সেখানে। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে বলিভিয়ার একটি শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বেসরকারি কম্পানিকে দিয়েও বিক্ষোভের মুখে পিছু হটেছিল সে দেশের সরকার।
তবে সরকারি খাতেও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যর্থতার নজির আছে। যেমন—নাইজেরিয়া; যেখানে ৯০ শতাংশ পানিরই অপচয় হয় চুরি ও লিকেজে। তবু লাগোসে পানিসেবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা রুখে দিয়েছিল দেশটির নাগরিকসমাজ। তাদের মত, বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে অসৎ রাজনীতিকদের পকেট ভারী হবে, পানিব্যবস্থার উন্নতি হবে না। অদক্ষতা, দুর্নীতি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে সরকারি খাতে রেখেই কম দামে ভালো পানি পেতে চায় সব দেশের মানুষ। তা নাইজেরিয়াই হোক, আর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রই হোক।

সৌজন্যেঃ কালের কন্ঠ

mm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *