পানির আরেক নাম মরণ!

মুষলধারে বৃষ্টি হয় যে দেশে প্রতি বছর, সে দেশের মানুষ দুর্ভাগ্যবশত বিশুদ্ধ পানির অভাবে নানা রোগে আক্রান্ত যা ভাবতেও কষ্ট লাগে। প্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির সংকট দূর করা খুবই সহজ যদি সরকার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।


কি করনীয় বা কিভাবে এ কঠিন সমস্যার সমাধান করা যায় সে বিষয়ে ঢোকার আগে কিছু তথ্য জেনে নেই বিশ্বের বড় বড় শহরের পরিকাঠামো সম্পর্কে।


ইউরোপের বেশিরভাগ রাজধানীর লোকসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি তাদের অন্যান্য শহর থেকে শুধু জার্মানি ছাড়া। জার্মানির চার থেকে পাঁচটি শহরের লোকসংখ্যা বেশ ঘনবসতিপূর্ণ কিন্তু তাদের সেই ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর সর্বমোট লোকসংখ্যা একত্র করলেও ঢাকার লোকসংখ্যার অর্ধেক হবে বলে মনে হয় না।


ঢাকা শহরে এত অল্প জায়গায় যে পরিমান লোকের বাস, তাদের বর্জ্য, মলমূত্র যে হারে ভূমিতে, নর্দমায় এসে জমা হচ্ছে তাতে করে কিভাবে সম্ভব বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং বিতরণ করা? জানিনা। তবে নানা ধরনের রোগব্যাধি থেকে শুরু করে প্রচন্ড গরমে ডায়ারিয়া এবং কলেরা হওয়ার সম্ভাবনা যে খুব বেশি তা নিশ্চিত। রোগব্যাধি হওয়ার কারণ শুধু খাবার নয় পানিরও ভূমিকা রয়েছে বড় আকারে। আমরা সবাই কম বেশি উপলব্ধি করছি যে দূষিত পানি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, যার কারনে লক্ষ লক্ষ লোক অকাল মৃত্যু থেকে শুরু করে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে গরমের এ সময় ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে, ঘরে বাইরে টয়লেটে বসে জীবন কাটাচ্ছে লাখো মানুষ ডায়রিয়ার কারনে।


বর্তমানে সারাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে টয়লেটে বসে সময় কাটানো মানুষের সংখ্যা এবং যে বর্জ্য তারা পরিত্যাগ করছে, কোথায় গিয়ে তা সংরক্ষিত হচ্ছে এবং কিভাবে তার মনিটরিং হচ্ছে? আমি জানিনা এবং অন্যরা কেমন করে ভাবছে বিষয়টি নিয়ে তাও জানিনা। তবে নাগরিকদের অসচেতনতা বা অবজ্ঞা আমাকে বিস্মিত করছে। সুশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু ভালো চাকরি খুঁজে পাওয়া নয় সচেতনতা বৃদ্ধি করা, তা কি সত্যিকারভাবে সম্ভব হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশে? ১৭ কোটি মানুষের দায়ভার ৩০০ সংসদ সদস্যের ওপর যা এক বিশাল দায়িত্ব। তাঁদের কি কিছুই করার নেই এ ব্যপারে? In modern Bangladesh, it reminds the early Pak period obstructing health and development. Shame for the rulers, greater shame for the voters. বাংলাদেশে পানির জন্য মানুষের এখনও লাইনে দাড়াতে হয়! ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসের স্মৃতি মনে পড়ে গেল আজ। সুইডেনে এসেছিলেন একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি বাংলাদেশ থেকে স্টকহোম ওয়াটার ফেস্টিভাল এক কনফারেন্সে। রাজার হাত দিয়ে তাঁকে বাংলাদেশের পানির উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর পুরষ্কৃত করা হয়েছিল।


ভদ্রলোক আমার বাড়িতে সেদিনের ডিনারে ঢাকা শহরের পানি সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন পরিকল্পপনার ওপর আলোকপাত করেছিলেন। তার সবকথা শুনে মনে হয়েছিল বাংলাদেশ পানি উন্নয়নের চলমান গতিতে রয়েছে। জানিনা তিনি এখন কোথায় বা কোন দায়িত্বে বা আদৌ কোন দায়িত্বে আছেন কিনা! তবে যারা সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং এসেছেন সুইডেনে বিশেষ করে পানির ওপর গবেষনা বা পর্যবেক্ষণ করতে তাঁরা যদি দেশে ফিরে কিছু না করে থাকে তবে বলব – It is shame to send people abroad with tax payers money, who have vague ideas on their subjects. যে দেশে রহমতের পানি (বৃষ্টি) পড়ে বছরে কমপক্ষে ছয় মাস অথচ তাদের পানির অভাব? ভাবতেও তো অবাক লাগার কথা কিন্তু এটাই ঘটনা।

নতুন প্রযুক্তির যুগে মরুভূমির দেশগুলো যদি পারে পানি সংকটের সমাধান করতে তবে কেন তা সম্ভব নয় বাংলাদেশে? গাছপালা, ফলমূল থেকে শুরু করে রান্না, হাতমুখ ধোয়া এবং গোসল করার জন্য দরকার বিশুদ্ধ পানির। আছে কি বিশুদ্ধ পানি বা হয়েছে কি সে ব্যবস্থা দেশের সর্বত্র? ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায় স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা দেয়া। পানির আরেক নাম জীবন, এ চিরপ্রচলিত কথাকে ভেঙ্গে বাংলাদেশে তার নতুন নামকরণ হয়েছে, তা হলো পানির আরেক নাম মরণ। কারণ একটিই তা হলো পানি আর পানি নেই, তা হয়েছে দুষিত এবং সবাই এখন পান করছে সেই দুষিত পানি। জেনে শুনে এই দুষিত পানি পান করা বা ব্যবহার করা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক এবং ব্যর্থতার এক প্রতিফলন। তবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে তাকে স্বল্প টেকনোলজির সাহায্যে পরিষ্কার করে সহজ উপায়ে তার ব্যবহার করা সম্ভব। কেমিক্যাল পদ্ধতিতে দূষিত পানি পরিস্কার না করে বরং স্বল্প খরচে এবং অল্প সময়ে বৃষ্টির পানিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের মানুষের পানির সংকট দূর করার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।


বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করার পর তা পরিস্কার করে ছয় থেকে নয় মাস মেয়াদে সহজেই সংরক্ষণ করা সম্ভব। যদি ছয় মাসের মধ্যে বৃষ্টি নাও হয় তাতে কোন সমস্যা হবে না কারণ বছরে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয় তা দিয়ে বাংলাদেশের সকল চাহিদার অবসান ঘটানো সম্ভব।


পানি সমস্যার সমাধান করা মানেই ১৭ কোটি মানুষকে প্রতিদিন মরণ বা দুষিত পানি পান করা থেকে রক্ষা করা। আমি নিজে জীবনের বেশির ভাগ সময় কাজ করেছি ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিতে এবং একজন ইন্ডাষ্ট্রি প্রভাইডার হিসেবে জানি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তার ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব। Today’s challenges, tomorrow’s solutions. আমরা বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন পরিকাঠামো তৈরি করেছি।


কিন্তু আমাদের ভেতরের শত্রু ( যেমন সিটিপ্লান, বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটানো, নদীর স্রোতের গতি বাড়ানো, গাছপালা রোপন করা, স্যানিটাইজেশনের মান উন্নয়ন করা ) দূর করার জন্যও তো পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে।


এখন প্রশ্ন কবে সম্ভব হবে এর সমাধান করা বা পরিবর্তন আনা? সোনার বাংলা গড়তে হলে লড়তে হবে শুরু থেকে এবং তার জন্য সকলের আন্তরিকতার আশু প্রয়োজন। দেহ আছে মন নাই, প্রাণ আছে জীবন নাই, এ কোন জাতি? এ তো বাংলাদেশের মানুষ জাতি। না এ নামে আমরা বাঁচতে চাই না।
আমরা দেহ মন প্রাণ এক সঙ্গে করে আনন্দের সঙ্গে বাঁচতে চাই। বাতাস, পানি, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, সুশিক্ষা, সভ্যতা, সংগঠন এবং সর্বোপরি ভাল ব্যবস্থাপনার সাহায্যে তৈরি করতে হবে দেশের পরিকাঠামো। শুধু বাঁচার জন্য নয় বাঁচার মত বাঁচতে হবে, তার জন্য দরকার পরিকাঠামোর সমন্বয় ঘটানো যা দেবে সমাধান এবং তা ঘটাতে হবে সারা দেশে- এখনই।

সৌজন্যেঃ দৈনিক যুগান্তর

mm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *