পানি সংকটে বিশ্ব

পানি একটি রাসায়নিক পদার্থ। যার বৈজ্ঞানিক সংকেত হল ঐ২০। ভূ-পৃষ্ঠের ৭০.৯ শতাংশ জুড়ে পানির অস্তিত্ব রয়েছে। পৃথিবীতে প্রাপ্ত পানির ৯৬.৫% শতাংশ মহাসাগরে, ১.৭% শতাংশ ভূগর্ভে, ১.৭% শতাংশ হিমশৈল বা তুষার হিসাবে, আর সামান্য পরিমাণ বড় জলাশয়ে, বায়ুমন্ডলে অবস্থিত মেঘ, জলীয়বাষ্প, বৃষ্টিপাত, তুষারপাত ইত্যাদি রূপে বিদ্যমান।
পানির অপর নাম জীবন। সুতরাং পানির গুরুত্ব কতটুকু তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পানি ছাড়া মানুষ তো বটেই পৃথিবীতে কোন প্রাণীর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। পানির অভাবে এ পৃথিবীর বহু জায়গায় প্রাণী সত্তা বিলীন হয়ে গেছে। সেজন্য দেখা যায়, পানির উৎস যেখানে বেশী সেখানে মানুষ তথা বিভিন্ন প্রাণী আর উদ্ভিদের সরব উপস্থিতিও বেশী। নদীমাতৃক দেশ হওয়ার কারণেই হয়তো বাংলাদেশে মানুষের আধিক্য অত্যধিক।
আশি কিংবা আগের দশকগুলোকে বাংলাদেশে গাছপালা-উদ্ভিদের আধিক্যও ছিল বেশ। কিন্তু পরবর্তীতে মানুষ নির্বিচারে গাছপালা নিধন করার দরুণ প্রয়োজন অনুপাতে গাছ-গাছালীর অস্তিত্ব কমে গেছে। এখন পানির উৎস আর আগের মতো নেই। ইতিহাসে ঘাঁটলে দেখা যায় পানির কারণে নিকট অতীতে কোটি কোটি মানুষ তাঁদের বসতবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। ওয়াটার : পিস এন্ড ফোর্সড ডিপ্লেশড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর প্রায় ৩৬% শতাংশ (দুইশত পঞ্চাশ কোটি) মানুষ পানির ঘাটতি পূরণের জন্য অন্যত্র পাড়ি জমাতে বাধ্য হবে।
আর, জাতিসংঘের মতে, পৃথিবীর প্রায় ৪০% শতাংশ মানুষ বর্তমানে পানি ঘাটতি সমস্যায় ভুগছে। ২০৩০ সাল নাগাদ অন্তত ৭০ কোটি মানুষ তীব্র পানির সংকটে বাধ্য হয়ে অভ্যন্তরীণ ভাবে অন্যত্র সরে যাবে। রিপোর্টটি গ্রহণ করার সময় জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস বলেন, বিশ্বনেতারা স্বীকার করেছেন যে বর্তমানে আমরা পানি সংকটের মুখোমুখি এবং নিকট ভবিষ্যতে পানিকে আমরা কিভাবে পূর্ণ-মূল্যায়ন এবং পরিচালনা করব সে ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা প্রয়োজন।
আমাদের পার্শ্ববতী দেশ ভারতও তীব্র পানির সংকটে ভুগছে। ২০১৯ সালের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে ভারতের প্রায় ৬০ কোটি মানুষের পানির সংকটে ভোগার কাহিনী প্রকাশ পায়। বর্তমানে কর্ণাটক রাজ্যের ৮০% এলাকা ও মহারাষ্ট্রের ৭২% এলাকা পানি সংকটের দিয়ে মধ্যে যাচ্ছে। ড্রামভর্তি একটি গাড়ির ট্যাংকার ভিড়লে সেখানে শতশত মানুষ হাহাকার করছে এক কলসি পানি নেওয়ার জন্যে। মারাত্মক পানি সংকটে কর্ণাটক রাজ্যে স্কুল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পানির উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ইতিমধ্যে চারকোটি বিশ লক্ষ মানুষ অভ্যন্তরীণ ভাবে অন্যত্র পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটউটের মতে, বিশ্বের ছত্রিশটি দেশ তীব্র পানির সংকটে আছে। তারমধ্যে এন্টিগা-বারমুডা, বাহরাইন, বার্বাডোস, কমোরোস, সাইপ্রাস, কাতার অন্যতম। এশিয়ার মধ্যে পানি সংকট আছে সিংগাপুর, আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, লিবিয়া, ইজরাইল, ইরান, প্যালেস্টাইন ও আরো অন্যান্য দেশ। মধ্যপ্রচ্যের মোটামুটি সবদেশেই পানি সংকটের হাহাকার রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম-এর ভাষ্যমতে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় দুইশত কোটি লোক বছরে অন্তত একমাস পানি ঘাটতির অধীনে বসবাস করে আর ৫০ কোটির মতো মানুষ সারাবছর পানির সংকটের মধ্যে দিয়ে যায়। সুদান, ভেনিজুয়েলা, ইথিওপিয়া, তিউনিসিয়া, কিউবার ২৩ কোটি লোক সুপেয় পানির অভাবে দূষিত পানি পান করে। উপরের কিছু তথ্যে এটা প্রতীয়মান হয় যে, সামনের দিনগুলোতে পানি সংকট মোকাবেলা করা আমাদের পক্ষে আরো বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
বাংলাদেশ ভূ-পৃষ্ঠস্থ ও ভূ-গর্ভস্থ পানি সম্পদের প্রাচুর্যে ভরপুর । অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাওড় ও পুকুর প্রভৃতির মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি সঞ্চিত থাকে। ঋতুভেদে ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার পরিবর্তিত হয়ে থাকে। অগাষ্ট মাসে বর্ষা মৌসুমে ভূ-পৃষ্ঠে পানির প্রবাহ থাকে সর্বোচ্চ। তখন প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার কিউসেক পানি দেশের উপর দিয়া প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারী মাসে শুষ্ক ঋতুতে ভূ-পৃষ্ঠে পানির পরিমাণ সর্বনি¤েœ উপনীত হয়। মাত্র সাত হাজার কিউসেক পানি উক্ত সময়ে প্রবাহিত হয়।
বাংলাদেশের পাললিক সমভূমিতে বিদ্যমান ভূগর্ভস্থ জলস্তরসমূহ দেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জলাধার হিসেবে বিবেচ্য। স্থান বিশেষে ভূপৃষ্ঠের কয়েক মিটারের মধ্যেই ভূগর্ভস্থ জলাধার পাওয়া যায়। বিশুদ্ধ পানি সবধরণের মানবাধিকারের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। সবার জন্য উন্নত উৎসের পানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে।
২০১৩ সালের এক জরিপে জানা যায় যে, সাতানব্বই শতাংশের বেশি মানুষের উন্নত উৎসের পানি পাওয়ার সুযোগ আছে। তবে বাংলাদেশে পুরোপুরি নিরাপদ পানি পানের সুযোগ এখনো সীমিত মাত্র ৩৪.৬ শতাংশ। ২০০০ সালের তুলনায় ২০১২ সালে আর্সেনিক যুক্ত পানি পানকারীর হার ২৬.৬ শতাংশ কমে ১২.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এরপরেও বিশ্বে সবচেয়ে আর্সেনিক দূষণ আক্রান্ত মানুষের বসবাস বাংলাদেশে।
চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ১৯,১৬৫ জন আর্সেনিক রোগী সনাক্ত হয়েছে যা বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। মিরসরাইয়ের প্রায় ১ লক্ষ পরিবার রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ঝুঁকিতে। উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্বেও এককোটি চুরানব্বই লক্ষ মানুষ এখনও অসহনীয় মাত্রায় আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে। এছাড়া ম্যাঙ্গানিজ, ক্লোরাইড ও লৌহ দূষণের কারণে সুপেয় পানির মান খুব খারাপ থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে এক-তৃতীয়াংশ পানির উৎসে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশী পরিমাণ ম্যাঙ্গানিজ বিদ্যমান। ৪১ শতাংশের বেশি মানুষ মলের জীবাণু রয়েছে এমন পানি পান করে। শহরাঞ্চলে বস্তিবাসীসহ অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত অঞ্চলে যেসব পানি খাওয়া হয় তার এক-তৃতীয়াংশেই উচ্চ মাত্রার ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ।
ইউনিসেফের মতে বাংলাদেশে প্রতি পাঁচটি পরিবারের দুইটি পরিবার নোংরা দূষিত পানি ব্যবহার করে। শহরের বস্তি, দ্বীপাঞ্চল, পাহাড়ি, জলাভূমি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বিশ্বাসযোগ্য পানির উৎস পাওয়া কঠিন। ঘনঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও পানির উৎস দূষিত হয়।
সুতরাং আমাদের অনেক পানির উৎস থাকলেও অত্যন্ত খামখেয়ালি এবং অব্যবস্থাপনার সাথে সেগুলোকে ব্যবহার করার কারণে সে সুপেয় পানির উৎসগুলো এখন অপেয় হয়ে উঠেছে। আমরা যদি এখনো সাবধানতা অবলম্বন না করি তাহলে নিকট ভবিষ্যতে আমাদের বড় মাশুল দিতে হবে। প্রতিবছর চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২-৩ মিটার নেমে যাচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি তোলার দরুণ এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জলাশয়, পুকুর ভরাট এবং অজ¯্র ভবনের কারণে বৃষ্টির পানিতেও ভূগর্ভস্থ পানির শূন্যতা ওভাবে পূরণ হচ্ছে না। যার কারণে ভূগর্ভে একধরণের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
আসুন, পানি ব্যবহারে সতর্ক হই, পানি দূষণে সতর্ক হই, পানি চলাচলের গতিকে স্বাভাবিক রাখি, পয়ঃনিস্কাশণ ব্যবস্থাকে আরো জোরদার ও হাইজিনিক করি। তবেই পানি আমাদের জীবনে সুস্থতা ও প্রয়োজনীয় প্রাপ্যতা বয়ে আনবে। নচেৎ পানিই হবে আমাদের জীবন সংহারের প্রধান উপকরণ।

লেখকঃ জহিরুদ্দীন মো. ইমরুল কায়েস

mm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *