পানি সঙ্কট মোকাবেলায় প্রয়োজন গুড গভর্ন্যান্স

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সঠিক এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য৷ মেধাদীপ্ত উদ্যোগই পারে এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় খুজে বের করতে৷ জীবন এবং সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে পানির প্রয়োজনীয়তা যেহেতু ব্যাপক তাই এর যথাযথ মূল্যায়ন করাও প্রয়োজন৷ এ জন্য বিশেষজ্ঞরা বিশ্বনেতাদের নিজ নিজ দেশে গুড গভর্ন্যান্স চালুর কথা বলেছেন৷ কেননা গুড গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে এ সঙ্কট উত্তরণের পথগুলো দ্রুত পরিষ্কার করা সম্ভব৷পানি কি, কোথায়, কখন, কি কারণে প্রয়োজন ও কিভাবে তা পাওয়া সম্ভব – এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য এবং তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে গুড গভর্ন্যান্সের গুরুত্ব অপরিসীম৷
 
পানি সম্পদের সঠিক প্রাপ্যতা ও পানি সেবা প্রদান, বিতরণ, যথাযথ পানি প্রশাসন আত্তীকরণ, বর্ধিত পানির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পানি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, আর্থ-সামাজিক কার্যক্রম এবং ইকসিস্টেমের মধ্যে পানির ব্যবহারে ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে জ্ঞানভিত্তিক নীতি প্রণয়নে কোনো বিকল্প নেই৷ ওয়াটার পলিসির এ গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং বৈধকরণ মূলত নির্ভর করে দেশের সরকারের ভূমিকা, সিভিল সোসাইটি এবং প্রাইভেট সেক্টরের দূরদর্শিতার ওপর৷ এ জন্য সরকারকে যে কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হতে হয়৷ দুর্নীতি রোধে সরকারকে কোন পথে, কি ধরনের ভূমিকা নেয়া, কি ধরনের ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম কার্যকর করা উচিত তা নির্ভর করে গুড গভর্ন্যান্সের ওপর৷
 
পানির উত্স, পানি সেবা প্রদান এবং সরবরাহ সিস্টেম বিশ্বব্যাপী যে দুর্নীতির বেড়াজালে আটকে আছে তা থেকে দ্রুত পরিত্রাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে গুড গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা করা জরুরি৷ কেননা বিভিন্ন কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, এসব দুর্নীতির ফলে সাধারণত গরিব মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ কিন্তু আশা করা হয়, এ ব্যাপক দুর্নীতি কমানো সম্ভব হলে তা গরিব মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি এবং নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে গ্রেটার গ্লোবাল একসেস তৈরি করতে সমর্থ হবে৷ এর ফলে সরকারকে দেয়া জনগণের ঘামঝরানো ট্যাক্সের টাকার অন্তত একটি উপযুক্ত ব্যবহার হবে৷এছাড়া পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা পানি প্রাপ্যতা আরো সহজ করে তুলতে পারে৷ পানি দূষণ এবং ইকলজিকাল ব্যালান্স প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সেফগার্ড হিসেবে কাজ করতে হবে৷
 
পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, পানি নিয়ে একেক দেশে একেক রকম আইন বিদ্যমান রয়েছে৷ এক দেশের আইনের সঙ্গে সাধারণত অন্য দেশের আইনের সাদৃশ্য খুব একটা খুজে পাওয়া যায় না৷ কারণ বিভিন্ন দেশের আইনগুলো তৈরি করা হয় সে দেশের প্রয়োজন, ভৌগলিক অবস্থান, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং নিজ স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে৷ এ ফ্যাক্টরগুলো সব দেশে একই রকম না থাকার কারণে একই বিষয়ের ওপর বিভিন্ন দেশের আইন ভিন্ন রকম হয়ে থাকে৷ এ কারণে অভিন্ন নদ-নদী এবং পানির উত্সগুলোর পানি ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমঝোতা অনেক ক্ষেত্রেই বাধার সম্মুখীন হয়৷ তাই এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক আইন থাকা জরুরি৷ যদিও বর্তমানে কিছু আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে৷ সেগুলো আন্তঃসীমান্ত পানিবিরোধ মেটাতে পারছে না৷ কেননা প্রত্যেক দেশই নিজের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে এতোটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, এ কাজ করতে গিয়ে তারা অন্যের অধিকার খর্ব করলেও সে ব্যাপারে তাদের কোনো মাথা ব্যথা থাকে না৷
 
কিন্তু পানি যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো দেশের ভৌগলিক অঞ্চলের একক সম্পদ নয় তাই এর ব্যবহারের অধিকার, এর গতিপথের আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে৷ এ জন্য প্রতিটি দেশেরই উচিত, যেসব দেশের সঙ্গে তাদের পানি নিয়ে সঙ্কট রয়েছে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান করা৷ এ জন্য আন্তর্জাতিক আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন করা বর্তমানে অত্যন্ত জরুরি বলে বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন৷এদিকে বিভিন্ন দেশের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রীতিনীতি ভিন্ন হওয়ার কারণে পানি বিতরণ বা সরবরাহ প্রক্রিয়ায় বৈষম্য দেখা যায়৷ ফলে প্রয়োজনীয় পানিপ্রাপ্যতার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেকে৷ পানিপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য আমাদের এ অঞ্চলে একটি নতুন বিষয় হলেও একেবারেই যে হচ্ছে না তা কিন্তু নয়৷ অন্যদিকে আফৃকার দেশগুলোতে পানি বিতরণের ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে৷ এসব অঞ্চলে প্রয়োজনীয় স্বাদু পানির উত্স ও পরিমাণ কম থাকায় মানুষের মধ্যে সব সময় পানির চাহিদা অত্যাধিক থাকে৷ আফৃকায় পানি অনেকটা দুর্লভ এবং মূল্যবান পদার্থ৷ তাই এর উত্সস্থলে পানি বিতরণের ক্ষেত্রে নারীদের বৈষম্যের শিকার হতে দেখা যায়৷
 
একই ধরনের সমস্যা সামান্য পরিমাণে হলেও ইনডিয়ার রাজস্থানসহ কিছু এলাকায় দেখা যাচ্ছে৷কৃষির সঠিক সম্প্রসারণ খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শর্ত৷ আর পানি ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অসম্ভব৷ বিশ্বের বর্ধিত জনসংখ্যার বড় আকারের খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য কৃষিকে সময়োপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে৷ এ ক্ষেত্রে কৃষিতে পানির প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে৷ আগামী প্রজন্মের খাদ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভূ-উপরস্থ পানির উত্স যেমন নদ-নদী, লেক, পুকুর, জলাশয়ের পানি কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের মাত্রা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকবে৷ তাই বর্তমান বিশ্বে স্বল্প পরিমাণ কৃষকের হাতে বেচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে কৃষিক্ষেত্রে পানির যথাযথ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি৷ মিলিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি)-র এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য কৃষি এবং স্যানিটেশন সেক্টরে পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা অন্তত প্রয়োজন৷
 
এদিকে সঠিক পানি ব্যবস্থাপনার অভাবে বিশ্বব্যাপী হুমকির মুখে পড়েছে ইকোসিস্টেম৷ ইকসিস্টেম হচ্ছে পরিবেশের সঙ্গে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর খাপওয়ানোর একমাত্র সিস্টেম৷ কিন্তু পানি স্বল্পতার কারণে ইকসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷ এর ফলে জীব সম্প্রদায়ে জীবনধারণ হুমকির মুখে পড়েছে৷ বাস্তুতন্ত্রেরও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ এ ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে শুধু সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা৷ বিশ্বের ইকসিস্টেমকে টিকিয়ে রাখতে এবং আগামী প্রজন্মের কাছে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার জন্য তাই এখনই সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন৷ এ জন্য শুভ গভর্ন্যান্সের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন পানি বিশেষজ্ঞরা৷
 
সৌজন্যেঃ অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী
mm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *