পরিবেশ বিপর্যয়, পানি সংকট ও বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন

একবিংশ শতকে এসে মানবজাতি নানাবিধ সংকটের মুখোমুখি হলো। এ সংকট শুধুমাত্র সভ্যতার সংকট নয়। রীতিমত অস্তিত্বের সংকট। প্রজাতি হিসেবে মানুষ এমন এক বৈরী পরিবেশের মুখোমুখি হয়েছে যে বর্তমান শতাব্দী নির্বিঘ্নে অতিক্রমের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে উঠছে। কোটি কোটি বছর আগে এ গ্রহের সৃষ্টি। প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশ কমপক্ষে কয়েক লক্ষ বছরের।

জানা তথ্য অনুযায়ী বিজ্ঞানীদের অভিমত হলো, মহাজাগতিক সংঘর্ষের ফলে ডাইনোসরের মত প্রাণিজগৎ বিলুপ্ত হয়েছে। সেটি ছিল নিতান্তই মহা প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এতে ঐ সময়কার প্রাণি ও উদ্ভিদকুলের কোন ভূমিকাই ছিল না। অথচ আজকের বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদি ধরে নেয়া হয় যে কয়েকশ বছরের ব্যবধানে বা যেকোন সময় যদি পৃথিবীতে কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় উপসি’ত হয় তবে তা হবে সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট দুর্যোগ বা বিপর্যয়। সেটি পারমাণবিক বিপর্যয়ই হোক বা জলবায়ু বিপর্যয়ই হোক।

একবিংশ শতকের সভ্যতা মাত্র কয়েকশ বছরের অব্যাহত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সাফল্যের ফসলমাত্র। খুব বেশি টানলেও একে ষোড়শ শতকের পূর্বে নেয়া যায় না। আবার বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের সময় থেকে ধরলে সভ্যতার ইতিহাস মাত্র তিনশ বছরের ইতিহাস। এসময় মানুষ অব্যাহতভাবে প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব বিস্তারে পা বাড়িয়েছে। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেছে বল্গাহীন অবিবেচনায়। ফলে বিশ্ব আজ মুখোমুখি হয়েছে জলবায়ু, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বরফগলা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, গ্রিন হাউস এফেক্ট ও ওজোন স্তর ফুটো হবার মত গুরুতর সমস্যার। এসব সংকটের সাথে অতি সমপ্রতি যোগ হয়েছে পানি সংকট। শুনলে অবাক হতে হবে, যেখানে পৃথিবীর তিন ভাগের দুভাগই জল সেখানে পানি সংকট কি আদৌ সত্য। অথচ পরিহাসের কথা হলেও বাস্তবতা হলো, পৃথিবী আজ পানি সংকটের মুখোমুখি এবং সে পানি হলো সুপেয় বা মিষ্টি পানি।

মিষ্টি বা সুপেয় পানির উৎস হলো বৃষ্টি, ভূ-গর্ভস’, বরফগলা, ঝর্ণা ও নদী, হ্রদ, হাওড়, দীঘির বদ্ধ পানি। একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায় মাত্র এক শতাব্দীতেই আমরা এসব সুপেয় পানির ভাণ্ডার ক্রমাগত সংকুচিত করে বিপদসীমায় এনে দাঁড় করিয়েছি মাত্র এক শতকের উন্নয়নের ধাক্কায়। জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মানুষের খাদ্যের যোগান দিতে গিয়ে পৃথিবীব্যাপী সবুজ বিপ্লব ঘটানো হয়েছে বিংশ শতকে। এক লাফে দ্বিগুণ মাত্রায় খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির এই ‘উফশী’ প্রযুক্তি মূলত পানিনির্ভর।

ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত কৃষিতে পানি ব্যবহৃত হয়েছে প্রাকৃতিক প্রাপ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে। অথচ ‘উফশী’ প্রযুক্তিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য পৃথিবীর বেশির ভাগ নদীর পানি প্রবাহ রুদ্ধ এবং নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। বিল, ঝিল, হাওড়, দীঘি, হ্রদগুলোকে ক্রমাগত দূষিত করা হয়েছে ‘উফশী’ প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত সার কীটনাশক দ্বারা। শস্যের জমিতে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশক চূড়ান্তভাবে দূষিত করেছে আশেপাশের সমস্ত খাল বিল নদীর পানি।

বিংশ শতকেই নগরায়ণ হয়েছে দ্রুত। কৃষিতে বর্ধিত পানির চাহিদা এবং নগরায়ণের ফলে এক জায়গায় জড়ো হওয়া মানুষগুলোর সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে হাত দেয়া হয়েছে ভূগর্ভস’ পানিতে। গোটা বিশ শতক ধরে হয় নদীর পানি শহরে আনা হয়েছে অথবা ডিপটিউবঅয়েলে পানি তুলে পৃথিবীর সমস্ত বড় ছোট শহরগুলোর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে একবিংশ শতকের প্রারম্ভেই দেখা যাচ্ছে ভূ-গর্ভস’ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। মনে রাখা দরকার ভেতর থেকে যে হারে পানি তোলা হচ্ছে নল দিয়ে দ্রুত গতিতে অথচ ভেতরে পানি ঢুকছে ফোটা ফোটা করে। ইতিমধ্যে বহু জায়গায় পানির স্তর খালি হয়ে শূন্য হয়েছে। ঐ শূন্যস’ান পূরণে যদি ভূগর্ভস’ শিলাচ্যুতি হয়ে ভূমিকম্পজনিত মহাবিপর্যয়ের সৃষ্টি হয় তবে অবাক হবার কিছুই থাকবে না।

ঊনিশ এবং বিশ শতকের সমস্ত উন্নয়নে জ্বালানো হয়েছে জৈব জ্বালানি অর্থাৎ মূলত তেল। তেল পোড়ালেই কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়েছে দুশো বছর ধরে। এই অব্যাহতভাবে নির্গত কার্বন তৈরি করেছে কার্বন মনো-অক্সাইড। ক্রমাগত ভারি হয়েছে বাতাস, সৃষ্টি হয়েছে গ্রিন হাউস এফেক্ট। অর্থাৎ সূর্যরশ্মি ভূ-পৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয়ে ঊর্ধ্বমুখি হয়ে যেসব ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান বায়ুর উর্ধ্বস্তরে নিয়ে যেত, সেগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার ওজোনস্তর ফুটো হবার কারণে সূর্যরশ্মি অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে ভূ-পৃষ্ঠে।

এ দুটো প্রতিক্রিয়ার সরাসরি ফলাফল হলো বিশ্ব উষ্ণায়ন বৃদ্ধি। তাপমাত্রার বৃদ্ধি মানেই মেরু অঞ্চলসহ হিমালয় অববাহিকার বরফ গলে যাওয়া। যে বর্ধিত হারে বরফ গলা শুরু হয়েছে, যদি অন্তত একশ বছর ধরে এই গতি অব্যাহত থাকে তবে পৃথিবীর সুপেয় পানির অনেক ভাণ্ডার শূন্য হয়ে যাবে।

ঝর্ণার পানি প্রবাহ, উজানে ক্ষীণ-নদীর স্রোতের মূল উৎস হিমালয়সহ মেরু অঞ্চলের জমাট বরফ গলা ও মৌসুমী বায়ু মূলত জমাট বরফের সাথে সম্পর্কিত। মৌসুমী বায়ু হিমালয়সহ পৃথিবীর অন্যান্য সব জমাট বরফে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে মেঘে পরিণত হয়। অর্থাৎ যতই বরফ কমে আসবে ততই মেঘ সৃষ্টি হবার প্রাকৃতিক প্রবণতা কমে আসবে। বৃষ্টির অনুপাত কমে আসবে। মৌসুমী বায়ুর তারতম্য ঘটে যাওয়া মানেই হলো পৃথিবীব্যাপী বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া।

আমরা ভাবলে আঁৎকে উঠবো এজন্য যে বৃষ্টির পানি যতই কমবে ততই সুপেয় পানির ভাণ্ডার সংকুচিত হবে। মানুষ প্রজাতি বেঁচে থাকার একমাত্র না হলেও প্রধানতম উপাদান হলো পানি। সমস্ত খাদ্যদ্রব্যের সাথে পানি গ্রহণ করার পরও মানুষসহ প্রায় সব প্রাণীই সরাসরি পানি পান করে থাকে। প্রাণীকুলের বেঁচে থাকা আর কৃষির জন্য সুপেয় পানির ভাণ্ডার কিভাবে অক্ষুণ্ন রাখা হবে সেটি আজকের অন্যতম ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস’াপনা ইনস্টিটিউট (আইডব্লিউএমআই) ইতিমধ্যে বিশ্ববাসীর প্রতি সর্তকবাণী উচ্চারণ করে বলেছে, যে হারে প্রতিনিয়ত সুপেয় পানির চাহিদা বাড়ছে, এ হার থামানো না গেলে বা পানির বিকল্প উৎস বের করা না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষি উৎপাদন মারাত্মক সংকটে নিপতিত হবে। আইডব্লিউএমআই এর পরিচালক কলিন চাট্রেস এর মতে যে হারে বিশ্বব্যাপী খাদ্যচাহিদা বাড়ছে এবং যে হারে ইথানল জ্বালানি উৎপাদনে শস্য উৎপাদনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে, তার সাথে তাল মিলাতে খাদ্য সংকটের চেয়ে পানির সংকটই প্রধান হয়ে দেখা দেবে।

এখন থেকে ‘ক্রপ পার ড্রপ’ নীতিতে এগুনো ছাড়া বিকল্প নেই। অর্থাৎ প্রতি ফোঁটা পানির বিনিময়ে আমরা কি পরিমাণ শস্য ফলাতে পারবো তাই-ই বিবেচনায় নিতে হবে। এতোদিন পর্যন্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনে পানির ভূমিকা একরকম উপেক্ষাই করা হয়েছে। যদিও সে সময় আর এখন নেই। মেঘে মেঘে বেলা পড়ন্ত বিকালে পৌঁছে গেছে।

আইডব্লিউএমআই এর হিসাব মোতাবেক চীনের উত্তরাঞ্চল, স্পেনের দক্ষিণভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলসহ বিশ্বের বহু এলাকায় ব্যবহারযোগ্য পানি দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বে বর্তমানে ১২০ কোটি মানুষ তীব্র পানি সংকটের মুখোমুখি। এর সাথে সমন্বয় করে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রতি ফোঁটায় কত শস্য বা ‘ক্রপ পার ড্রপ’ নীতিতে এগোনো ছাড়া আর কোন বিকল্প থাকে না।

তেলের জন্য গোটা মধ্যপ্রাচ্যে আজ বারুদের গন্ধ। শুধুমাত্র ইসরাইলের সুপেয় পানি সরবরাহের রিজার্ভার ‘সেবা’ নামক জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কয়েক দশক ধরে ইসরাইল-লেবানন বিরোধ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে অর্থাৎ গত হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বেশিরভাগ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলোর মূলে ছিল স্বর্ণ, রৌপ্য, কয়লা, তেল, শস্য ও বনজ সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ। একবিংশ শতকে যোগ হতে চলেছে আর একটি প্রাকৃতিক সম্পদ পানি। সমুদ্রের জলসীমা তথা পানি নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক বিরোধ ঘটে গেছে। সুপেয় পানি নিয়ে লেবানন-ইসরাইলের মল্লযুদ্ধ মাত্র সেদিনের ঘটনা, সুপেয় পানির কর্তৃত্ব নিয়ে লড়াই আরো বহু এলাকায় বিস্তৃত হবে সেটাই স্বাভাবিক।

ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো শহরে চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। অথচ খাবার পানির কি তীব্র সংকট। এ সংকট দিনের পর দিন আরো বাড়বে। সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন আমাদের আশপাশের নদীগুলোর পানি ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়বে। ভূ-অভ্যন্তরের পানি আর তোলার মতো অবস’ায় পাওয়া যাবে না। ভাবতেও কষ্ট হয়, শান শওকতের এই নগর সভ্যতা তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে সবার চোখের সামনে। এবং তা ঘটবে শুধু পানি সংকটের কারণে। পানি সংকট সমাধানে আরো অনেকগুলো বিকল্প নিয়ে সমন্বয় করাও জরুরি। খাল, বিল, দীঘি, পুকুর, হাওড়, ঝিল, ছোট বড় হ্রদগুলোর সুপেয় পানি ভাণ্ডার বৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়, ভূ-গর্ভস’ পানির অন্যতম উৎস এসব বদ্ধ জলাধারগুলোর অস্তিত্ব।

তাই সঠিক কথাই বলেছেন আইডব্লিউএমআই কর্মকর্তা ডেভিড মোলভেন, তাঁর মতে, দরিদ্র দেশগুলোর কৃষকদেরও এখন থেকে পানি ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। ব্যবহৃত পানি দিয়ে কিভাবে কৃষি উৎপাদন সর্বোচ্চ করা যায় এই চিন্তা এখন সরকারিভাবেও করতে হবে। কৃষিপ্রধান এ দেশের কৃষির প্রাণ হলো সুপেয় পানি। আবহমান কাল ধরে এদেশের জনজীবনের প্রাণও তাই স্বাভাবিকভাবে সুপেয় পানি। তাই অন্যসব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সাথে পানি ব্যবস’াপনায় গুরুত্ব দিতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। নচেৎ আরো পরে ঠিকই উদ্যোগ নিতে হবে তবে বলতে হবে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

 

লেখাঃ শঙ্কর প্রসাদ দে
দৈনিক সুপ্রভাত

mm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *