বাংলাদেশের পানি সমস্যা

 
গত প্রায় দশ বছর যাবত বাংলাদেশের নাগরিক তাদের বাসা বাড়ি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপদ পানির যে সরবরাহ পেয়ে আসছে তাকে আশানুরূপ বলা না গেলেও, এক্ষেত্রে যে একটা ধারাবাহিক উন্নতি ঘটেছে তা বেশ আঁচ করা যায়। তবুও নগর জীবনে পানির সরবরাহ নিয়ে ভোগান্তির শেষ নাই। বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে পানি নিয়ে দুর্ভোগ লেগেই থাকে। গ্রাম এলাকা আর শহর এলাকার পানি সরবরাহের মধ্যেও কিন্তু বিস্তর অনিয়ম রয়ে গেছে। আশার কথা হল, বাংলাদেশ সরকার নিরাপদ পানি সরবরাহ নিয়ে বেশ কিছু প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্প চালিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কিছু বিষয় নিয়ে সরকারের নজর দেওয়া উচিত। নিরাপদ পানির সংকটের ফলে নারী ও শিশুর উপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ে এই বিষয়টি সেসব বিষয়ের মধ্যে অন্যতম।
 
ইউনিসেফের হিসেব মতে, ৯৭ শতাংশ মানুষ এখন নলকূপ ব্যবহার করতে পারে। সরকার, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় নিরাপদ নলকূপের সুবিধা সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে অনেক মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি পলকেই কমে গেছে। ডায়রিয়া কিম্বা কলেরার মতন মারাত্মক পানিবাহিত রোগের যে প্রকোপ ছিল, তা যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় Water crisis in Dhaka Bangladeshকমে এসেছে। এ থেকেই কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যায়, এই নিরাপদ পানি সরবরাহের প্রভাব কতটুকু। অথচ সরকার এখন ভূমিসংলগ্ন পানি দেশব্যাপী সরবরাহের ব্যবস্থা বিষয়ে মনোযোগ কমিয়ে দিয়েছে। সরকারের পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ইদানিংকালের কর্মসূচিগুলো অধিকাংশই ভারী প্রকৌশল ভিত্তিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙ্গন ও ভূমিধ্বস প্রতিরোধ কেন্দ্রিক। ফলত বাড়িঘরে নিরাপদ পানি সরবরাহের ব্যাপারটি এখন যেমন অবহেলিত হচ্ছে, তেমনি বিষয়টি আশু ঝুঁকির কারণ হয়েও দাঁড়িয়েছে।
 
বাংলাদেশের বিপুল জনগণ উল্লেখিত কারণে পানি বিষয়ক আশু ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। আমরা যদি এখন শিল্পকারখানার ব্যাপক বিস্তার, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা ও কৃষিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের দিকে নজর দিই, তবে সেই ঝুঁকি আরো দ্বিগুণ ভয়াবহতা নিয়ে আমাদের সামনে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতন হাজির হবে। প্রত্যেক দিন ২০ লক্ষের মতন অপরিশোধিত বর্জ্য নির্বিবাদে শহরের পার্শ্ববর্তী নদীতে নিক্ষেপিত হচ্ছে। আর গবেষণা বলছে, আট লিটার পরিষ্কার পানি দূষিত করতে মাত্র এক লিটার বর্জ্যই যথেষ্ট।
 
বাংলাদেশে ৯২ শতাংশ পানির সরবরাহ আসে আভ্যন্তরীণ নদীগুলো থেকে যার অধিকাংশই ভারত আর চীন থেকে প্রবাহিত। এর মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ আসে আঞ্চলিক বৃষ্টিপাত হতে। ভৌগলিকভাবে উঁচুতে অবস্থিত এইসব দেশ থেকে বাংলাদেশে পানির সরবরাহও ধারাবাহিক নয়। তাদের আভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য তারা তাদের নদীর পানিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ভূমিপৃষ্টের পানির ক্ষেত্রেই যে এই অপ্রতুলতা লক্ষ্যণীয় তা কিন্তু নয়; ভূগর্ভস্থ পানির মজুদও বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসছে। শহরের পানি ব্যবস্থার দায়িত্ব সরকার নিলেও গ্রামে এ বিষয়ক কোন কর্তৃপক্ষকে সক্রিয় দেখা যায় না। ফলত তাদের নিজেদের নলকূপের উপর নির্ভর করতে হয়। এবং দুর্যোগকালে এই পানিকে কেন্দ্র করেই হতে থাকে নানাবিধ রোগবালাই। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তাই পানি ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে বিশেষ স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
 
প্রতিদিন ঢাকা শহরে ২.২ শত কোটি লিটার পানির প্রয়োজন। অথচ সরবরাহের জন্য উৎপাদিত পানির পরিমাণ ১.৯ শত কোটি লিটার। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম থেকে পানির সর্বোচ্চ সরবরাহ আসে। এই সরবরাহের পরিমাণ দৈনিক ২১ কোটি লিটার এবং দৈনিক চাহিদা হল ৫০ কোটি লিটার। এই যে সরবরাহকৃত পানি এটি অধিকাংশ সময়ই পানের অযোগ্য থাকে। এই পানি পান করতে হলে ফুটিয়ে পান করতে হয়। এই পানি ফুটাতে গিয়ে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর অত্যাধিক চাপ পড়ছে। গ্রীষ্মকালে পানির মজুদের যে দশা হয় তাতে নগরবাসীর জন্য জীবন টিকিয়ে রাখা সত্যিই কষ্টকর হয়ে পড়ে।
 
স্বাস্থ্য বিষয়ক সরকারি কর্তৃপক্ষ জনসাধারণ বলে এসেছে নলকূপের পানি সুপেয় ও নিরাপদ। অথচ ১৯৯০ সাল থেকে দেশব্যাপী যে আর্সেনিকের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল তখন থেকেই কিন্তু বিপুল জনগোষ্ঠী আর্সেনিক জনিত কারণে নানাবিধ রোগের ভুগেছে। এই সমস্ত রোগে ভোগা জনগোষ্ঠী আবার সামাজিকভাবে নিগৃহিতও হয়েছে। এই সমস্যাটা দেশে উত্তরাঞ্চলে বেশী। এবং এই অঞ্চলের মানুষ আবার ক্ষরার শিকার। গৃহস্থালির কাজে পানির ব্যবহারের জন্য এই অঞ্চলের নারীদের অমানুষিক কষ্ট সহ্য করতে হয়। অনেক সময় পানি সংকট গৃহ অভ্যন্তুরে নারী নির্যাতনকে বাড়িয়ে তোলে। উপকূলীয় অঞ্চলে যেখানে পানির সরবরাহ মোটামুটিভাবে ঠিকঠাক থাকে সেখানেও নারীদের এই ভোগান্তি থেকে রেহাই নাই। লবণাক্ততাও কারণে তাদের পানি পানযোগ্য নয়। তাই এই পানির লবণাক্ততাও এখন বিশেষ ভোগান্তি কারণ।
 
দেশের দক্ষিণাঞ্চল বাগেরহাটের দিকে পানির প্রাপ্যতাকে কেন্দ্র করে বিবাহের সম্বন্ধ হবে কি হবে না সেটা নির্ধারিত হয়। তাছাড়া লবণাক্ততার কারণে নারীদের চর্মজাতীয় বিবিধ সমস্যা তৈরি হয় যা এই জাতীয় বিবাহ বা সামাজিক বন্ধনের ক্ষেত্রে নেতিবাচিক ভূমিকা রাখে। পানি নিয়ে সমস্যাটা মূলত দেখা যায় ভূগর্ভস্থ পানির উপর অতিরিক্ত চাপের ফলে। গবেষকরা বলছেন, গত দশকের তুলনায় এখন ভূগর্ভস্থ পানি তিন মিটার নিচে নেমে গেছে। দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নকে অনেকে ইতিবাচক দিক হিশাবে উল্লেখ করলেও দেখা যাচ্ছে এর ফলেই পানি সমস্যা প্রকটিত হচ্ছে। এর কারণ এই দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়ন আদতে অপরিকল্পিত। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ সামনের দিনগুলোতে পানিকে কেন্দ্র করে মারাত্মক দুর্যোগের সম্মুখিন হবে।
 
নাসিফ ফারুক আমিন
লেখক, গবেষক
mm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *