বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ

নদীমাতৃক বাংলাদেশে একসময় সুপেয় পানির প্রধান উৎস ছিল পুকুর, নদী ও খালে বৃষ্টির জমিয়ে রাখা পানি। কিন্তু বর্তমানে বিপুল জনসংখ্যার ফলশ্রুতিতে পানির প্রয়োজন মিটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া বর্তমানে কৃষিতে সেচের জন্যও ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন বেড়েছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর ৩ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে পানির স্তর আরো নেমে গেলে দেশ পানি সংকটে পড়তে পারে বলে আশংকা রয়েছে।

এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যায়। বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার আগে সংরক্ষণ করাকে “রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং” বলে। পৃথিবীর প্রায় অনেক দেশে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পানির প্রয়োজন মেটানো হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যাতে নিচে নেমে না যায় সেই জন্য বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতে হবে। তাছাড়া বৃষ্টির পানিতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেক কম। বৃষ্টির পানি অনেক বিশুদ্ধ এবং সহজেই পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে তিন হাজার মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। উপকূল ও পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি। যদি এসব অঞ্চলে বৃষ্টির পানি সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করা যায় তাহলে দৈনন্দিন ব্যবহারে সবাই সুফল পাবে। বাংলাদেশে গড়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৪৬০ মিলিমিটার। যার অধিকাংশ হয় বর্ষা মৌসুমে।

ভবনের নিচে অথবা ছাদে বিশেষ ব্যবস্থায় রিজার্ভার স্থাপন করে সহজেই বৃষ্টির পানির ধরে রাখা যায়। ভবনের নিচে টেকসই রিজার্ভার, পানির ট্যাংক অথবা খনন করে তাতে সিমেন্ট অথবা পুরু পলিথিনের আস্তরণ দিয়ে ট্যাংক বানিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। বৃষ্টির পানি ট্যাংকে রিজার্ভ করতে পাইপের সাহায্য নেয়া যায়। এমন জায়গায় পাইপ বসাতে হবে যাতে বৃষ্টির পানি সব সেই পথে বেড়িয়ে এসে রিজার্ভারে এসে জমা হয়।

পাশের দেশ ভারতের আহমেদাবাদসহ ইউরোপের অনেক দেশে এই পদ্ধতির সফলতা রয়েছে। বারমুডাতেও বৃষ্টির পানি এভাবে ধরে রেখে সারা বছর ব্যবহার হয়। তাছাড়া যেসব এলাকায় পানি স্বল্পতা রয়েছে সেখানে আইন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । ভারতের রাজস্থানসহ বেশ কিছু রাজ্যে এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও এভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উপর জোর দিয়ে সুপেয় পানির সংকট মোকাবেলা করা যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবার কাছে রোল মডেল হতে পারে।

বাংলাদেশে আগে ভূ-উপরিভাগে পানি অতিমাত্রায় ব্যবহার হতো। কিন্তু নগরায়নের সাথে সাথে পুকুর খালবিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় ভূ-গর্ভের পানির রিজার্ভের উপর চাপ বাড়তে থাকে। এবং পানির প্রচুর চাহিদার কারণে মাটির নিচের পানির চাপ কমতে থাকে। এছাড়া আকাশচুম্বী ভবন, মাটির উপর কংক্রিটের আস্তরণ, রাস্তায় কার্পেটিং, অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে বৃষ্টির পানি আগের মত ভূগর্ভে কম মাত্রায় প্রবেশ করে, ফলে আগের মত ভূ-গর্ভে পানির রিজার্ভ হয়না। তাছাড়া বৃষ্টিপাত কমে যাওয়াও অন্যতম কারণ।

বর্তমানে আমাদের দেশের অধিকাংশ জেলার পানির স্তরই স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে নিচে নেমে গেছে। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের জন্য বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং মাটিতে বৃষ্টির পানির প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া ক্রমাগত পানির স্তর নিচে নেমে গেলে যে কোন সময় বড় ধরনের ভূমিধ্বস হতে পারে। তাই আমাদের এখুনি সচেতন হতে হবে এবং কারো মুখাপেক্ষী কিংবা সরকারকে দোষারোপ না করে সবার আগে নিজেদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে।

mm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *