বৃষ্টির পানি নিয়ে চিন্তাভাবনা

১।
তাত্বিকভাবে বৃষ্টির পানি পৃথিবীর বিশুদ্ধতম প্রাকৃতিক পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম। মাটির নিচের ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রন, আর্সেনিক, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি সহ বিভিন্নরকম খনিজ পদার্থ থাকে যায় কিছু হয়তো আমাদের জন্য ক্ষতিকারক, কিছু হয়ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় অসুবিধা সৃষ্টি করে। আবার, প্রাকৃতিক জলাধারের পানিতে ভাসমান ময়লা, পলি ইত্যাদি ছাড়াও বিভিন্ন রকম অনুজীব ও জীবানু থাকে। সেই তুলনায় বৃষ্টির পানি খুবই পরিচ্ছন্ন এবং বাতাসে দূষণকারী এসিড গ্যাস এবং ধুলাবালি না থাকলে এটাতে কোনোরকম দূষণ নাই।

একটানা বৃষ্টি হলে তাই প্রথম দিকের কয়েক মিনিটেই বাতাসের ধুলাবালি, গ্যাস সহ দুষিত পদার্থ বৃষ্টির পানির সাথে পতিত হয়, এবং পরবর্তী সময়ের বৃষ্টির পানি থাকে খুবই পরিষ্কার। এজন্য বৃষ্টির পানি সরাসরি যদি ধরে রাখা যেত তাহলে পানযোগ্য পানি সহ অনেক সমস্যা সহজে সমাধান করা যেত।

কিন্তু সমস্যা হল, আমাদের দেশে সারাবছর সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। ফলে এর উপর নির্ভর করে কোনরকম সরবরাহ ব্যবস্থা নকশা করা বাস্তবসম্মত হয় না। বৃষ্টির পানিকে অবশ্য বড় জলাধারে আটকে রাখা যায়। আমাদের নদীগুলো দিয়ে যেই পানি গিয়ে সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে মেশে সেগুলোও কিন্তু উজানের দিকের কোনো না কোনো অংশের বৃষ্টির পানি। যা হোক বড় আঙ্গিকে চিন্তা করলে সরকারের বড় বড় প্রকল্প করে এই বৃষ্টির পানিকে নিরাপদ উপায়ে আটকে রাখার প্রকল্প নেয়া যেতে পারে।

২।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানির ফোঁটা যেমন একসময়ে সিন্ধু গড়ে তোলে তেমনি ছোট ছোট চেষ্টাগুলোই একসময় বিরাট কিছু সফলতা এনে দিতে পারে। তাই বাড়ির ছাদের বৃষ্টির পানিকে যেমন তেমন ভাবে চলে যেতে না দিয়ে অল্প এককালীন খরচ করে সেটাকে ব্যবহারের প্রয়াস নেয়া যেতে পারে। প্রথম ব্যবহার হতে পারে দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য পানিটাকে মাটিতে পড়ে ময়লা হওয়ার আগেই ধরে রাখা। যেহেতু ছাদে আগে থেকেই হয়তো কিছু ধুলাবালি থাকতে পারে, বৃষ্টির পানির সাথে সেগুলোও চলে আসবে। তাই পানি সরাসরি ব্যবহার না করে একটু থিতিয়ে ও ফিল্টার করে তারপর সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা উচিত।

তবে কেউ যদি ইট বা কংক্রিট দিয়ে অসুবিধাজনক মনে করেন তবে সহজে সরানো ও স্থাপন করা যায় এমন পিভিসি পানির ট্যাংকি (গাজি, সেরা ইত্যাদি) ব্যবহার করেও এরকম স্থাপনা তৈরী করতে পারেন। নিচের চিত্রে এমনই একটা স্থাপনা দেখানো হয়েছে। অবশ্য এটা যেই স্থানের কথা মাথায় রেখে তৈরী করা হয়েছে সেটা হল একটা সাইক্লোন সেন্টার। সেখানে সাইক্লোনের পূর্বাভাষ পেলেই রান্নাঘরের ছাদের ট্যাংকিতে গভীর নলকূপ থেকে পানি ভরে রাখবেন। সাইক্লোনের তাণ্ডবে যদি বিদ্যূৎ ব্যবস্থা অকার্যকরী হয়ে যায় তাহলে এই পানি অন্ততপক্ষে কয়েকদিন তাঁদেরকে পানযোগ্য ও রান্নার উপযোগী বিশুদ্ধপানি দিবে। এর সাথে বৃষ্টির পানি ধরার ব্যবস্থা যুক্ত করলে বিষয়টার পানি প্রাপ্তির নিরাপত্তা আরও বৃদ্ধি পাবে – যেহেতু সাইক্লোনের পরবর্তী সময়েও সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া অন্য সময়ে (বর্ষাকালে) বৃষ্টির পানি ব্যবহার করলে সেই পানির জন্য বিদ্যূত খরচ করে গভীর নলকূপ ব্যবহার করতে হবে না, কিংবা কম হবে।

ঢাকার মত শহরগুলোতে বৃষ্টি একটু কম হয়। কিন্তু প্রায় সম্পুর্ন শহরে খোলা জায়গা কমে যাওয়াতে সেই পানির প্রায় পুরাটুকুই মাটিতে প্রবেশে ব্যর্থ হয়ে ড্রেনেজ সিস্টেমে প্রবেশ করে এবং কিছু সময়ের জন্য কোনো কোনো এলাকা ময়লা পানিতে ডুবে যায়। এখানে কেন্দ্রীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আছে, তাছাড়া এখানে প্রতি বর্গফুট জায়গা অত্যন্ত দামী, এবং বৃষ্টিপাত কম বলে হয়তো বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ খুব একটা আকর্ষনীয় কিছু হবে না। তবে যদি বৃষ্টির পানিকে ড্রেনে যেতে না দিয়ে সরাসরি মাটির নিচের বালুর স্তরে প্রবেশ করিয়ে দেয়া যায় তাহলে দুইটি লাভ হবে। প্রথমতঃ জলাবদ্ধতা হ্রাস কিংবা সম্পুর্ন সমাধান করতে পারে। দ্বিতীয়তঃ ভূগর্ভের সংরক্ষিত হয়ে সেই পানিস্তর রিচার্জ করবে। এই দ্বিতীয় বিষয়টি ঢাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এখানে পানি স্তর নিচু হতে হতে প্রায় গভীর নলকূপগুলোকে অকেজো করে ফেলছে।

এছাড়া ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানে নিচের মত করেও ময়লা পানি প্রাকৃতিক উপায়ে শোধন করে ভূগর্ভের পানি স্তর রিচার্জ করা যেতে পারে।

লেখাঃ Miah M. Hussainuzzaman

Facebook Comments
Share This Post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *