বিশ্ব পানি দিবস, আঞ্চলিক পানি রাজনীতি ও বাংলাদেশ

গত ২২ মার্চ ছিল বিশ্ব পানি দিবস।  বিশ্বের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগই পানি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিপাদ্য দিবসের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাতিসংঘ থেকে বলা হয়, বর্তমানে বিশ্বের ১৫০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান পানির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। পানি যদি বিশুদ্ধ থাকে তাহলে আরও বেশি পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দূষিত পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে প্রতিবছর বিশ্বে ২০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। এ কথা বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের সবগুলো দেশের জন্যই সত্য। এ অঞ্চলের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এখনো কৃষি। শিল্পায়নের দিকে দীর্ঘ যাত্রার পরও এ গোটা অঞ্চলের বিশেষত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এখনো মূলত কৃষিনির্ভর অর্থনীতিরই দেশ। অজস্র আন্তর্জাতিক নদী ও তার পানিবণ্টন নিয়ে রয়েছে আলাদা রাজনীতি, যার প্রভাব সরাসরি দেশগুলোর মানুষের ওপর এসে পড়ে। আঞ্চলিক এ পানি রাজনীতিতে চীনও সংযুক্ত। মূলত উজান ভাটির দেশগুলোর মধ্যে পানির বণ্টন নিয়ে রয়েছে দ্বন্দ্ব।
বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে ভারতের সরাসরি দ্বান্দ্বিক অবস্থান। এক্ষেত্রে তিস্তা চুক্তি নিয়ে চলমান বিতর্কের কথা স্মরণযোগ্য। আর চীনের সঙ্গে ভারতের রয়েছে ব্রহ্মপুত্রের পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধ। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু অববাহিকার পানি বণ্টন নিয়েও একই ধরনের বিরোধ বিদ্যমান। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি বণ্টনের মিমাংসা হওয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে পানি ব্যবস্থাপনায়ও নেয়া প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনায় চরম সংকট বিরাজ করছে। একদিকে ভূপৃষ্ঠের পানি অর্থাৎ নদ-নদী ও জলাশয়ের পরিমাণ কমে আসছে, অন্যদিকে নেমে যাচ্ছে ভূ-অভ্যন্তরস্থ পানির স্তর। এর সঙ্গে রয়েছে দূষণের ভয়াবহ মাত্রা। শুধু রাজধানী ঢাকার দিকে তাকালেই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজধানীকে ঘিরে রাখা চার নদী- বালু, তুরাগ, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা এ সবগুলোর অবস্থাই সঙ্গীন। দূষণ ও নদী সংকোচনের নিদারূণ এক শিকারে পরিণত হয়েছে এ নদীগুলো। একই সঙ্গে বলা যায় রাজধানীর অভ্যন্তরস্থ জলাশয়গুলোর কথা। অধিকাংশ জলাশয়ই এখন স্মৃতি কেবল। প্রচুর অর্থ ব্যয়ে হাতিরঝিলের মতো কিছু প্রকল্পের মধ্য দিয়ে এসব জলাশয়ের মাত্র কিছুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার হওয়া বা সংরক্ষণের আওতায় আসা এসব জলাশয় যে মূলত অভিজাত শ্রেণির দিকে দৃষ্টি রেখে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গুলশান, হাতিরঝিল বা ধানমণ্ডীর লেকগুলো সংরক্ষণে প্রশাসন যতটুকু যা করে তার ঠিক বিপরীত আচরণ করে নিম্নাঞ্চলের এবং তুলনামূলক দরিদ্র অঞ্চলের জলাশয়গুলোর প্রতি। বাংলাদেশে মোট পানির মাত্র ২ শতাংশ ব্যবহার হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয়। অথচ প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর মিষ্টি পানির উম্মুক্ত উৎসগুলোর ৭০ শতাংশই শিল্পকারখানা থেকে বের হওয়া বর্জ্যরে কারণে দূষিত হয়ে পড়েছে। এখন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উম্মুক্ত পানি বাদ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার শুরু করেছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিপদসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলের পানির ব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ওই গবেষণা ফলাফল নিয়ে পরিবেশ-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ডব্লিউডব্লিউএফ ও তৈরি পোশাক বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান এইচএনএম গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের পানিসম্পদের সুশাসন নিয়ে আরেকটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, শিল্পকারখানাগুলোয় বর্তমান পানি ব্যবহারের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু ঢাকায় পানির চাহিদা আড়াই গুণ বাড়বে। এতে বাংলাদেশ সরকারকে পানি ব্যবস্থাপনা বাবদ বছরে খরচ করতে হবে ৭০০ কোটি ডলার। সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণা থেকে জানা গেছে, দেশের ২ কোটির ওপর মানুষ এখনো আর্সেনিক দূষণের শিকার।
প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ এ দূষণের কারণে অসুস্থ হচ্ছে। বছরে মৃত্যুর আশঙ্কাও ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ দূষণ রোধে নেয়া হচ্ছে না বিশেষ কোনো ব্যবস্থা। আর্সেনিক দূষণ থেকে বাঁচতে সরকারের একমাত্র পদক্ষেপ হচ্ছে গভীর নলকূপ স্থাপন। এসব গভীর নলকূপ স্থাপনেও ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি একমাত্র গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে এ সমস্যা নিরসন সম্ভব নয়। বরং ভূ-অভ্যন্তরস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার ফলে ক্রমবর্ধমান ভূমিকম্পের যে আশঙ্কা তা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে এর ফলে। অন্যদিকে জাতিসংঘের পানি-বিষয়ক সংস্থা ইউএন ওয়াটার বলছে, বাংলাদেশের পানির ব্যবহারের সবচেয়ে মারাত্মক দিক হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। ভূ-উপরিস্থ পানির সরবরাহের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষে থাকা দেশ হলেও বর্তমানে দেশের শিল্প, কৃষি ও গৃহস্থ কাজে ব্যবহৃত হওয়া পানির ৭৯ শতাংশ ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করে ব্যবহার করা হচ্ছে। সংস্থা দুটির গবেষণায় দেখা গেছে, এখনো বাংলাদেশের পানির সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় কৃষিতে। এ খাতে ৮৮ শতাংশ পানি ব্যবহার হয়। গৃহস্থ কাজে ব্যহার হয় ১০ শতাংশ পানি। আর মাত্র ২ শতাংশ পানি শিল্পকারখানা ব্যবহার করে। কিন্তু দূষণের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে শিল্পখাত। ভূপৃষ্ঠের পানির উৎসগুলো চরমভাবে শিল্পবর্জ্যরে দূষণের শিকার। এক্ষেত্রেও প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে কিছু জরিমানা বা নদ-নদীর সীমানা নির্ধারণ ছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। দেশের বেশির ভাগ শিল্পকারখানায় এখনো বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র (ইটিপি) স্থাপন করা হয়নি। এছাড়া বেশির ভাগ শিল্পকারখানা নদী ও জলাশয়ের তীরে গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে পানির ব্যবহার কম হলেও এ খাত থেকে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। জলাশয়ের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা একটি নির্দিষ্ট মানে না থাকলে তাতে কোনো জীব জীবনধারণ করতে পারে না। ফাইটো ও জুও প্লাঙ্কটনের পক্ষেও টিকে থাকা অসম্ভব হয়। পানিতে ন্যূনতম ৫ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকতে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের আশেপাশের জলাশয়গুলোয় এ দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক কম। কোনো কোনোটিতে এটি এক মিলিগ্রামেরও নিচে। অর্থাৎ এসব অঞ্চলের জলাশয়গুলো যেকোনো জীবের জীবনধারণের অনুপযোগী। এ অবস্থায় কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার অভাবে জীববৈচিত্র্যও পড়ছে হুমকির মুখে। কিছুটা ভালো হলেও প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোয়। এক সুন্দরবন দিয়ে বিচার করলেই এর মাত্রা ভালোভাবে অনুধাবন করা সম্ভব। সুন্দরবনের শেলা নদীতে তেলের ট্যাঙ্কার ডুবির ঘটনা ঘটার পর, সম্প্রতি আবারো সেখানে কয়লাবাহী জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গেতো লবণ ও চিংড়ি চাষীদের ঘেরের দৌরাত্ম রয়েছেই। ফলে শুধু শেলা নয়, পশুরসহ ওই অঞ্চলের সব নদীই রয়েছে সঙ্কটে। এক্ষেত্রে আমরা এখনো ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের মর্ম উপলব্ধি করতে সক্ষম হইনি। বনাঞ্চল সংরক্ষণের বিষয়টি রয়ে গেছে কেবল কাগজে পত্রেই। এক্ষেত্রে প্রশাসনের যোগসাজশ থাকার বিষয়টি সবারই জানা। বিশ্ব পানি দিবস পালনের অনুষ্ঠানে বাগাড়ম্বরের পরিবর্তে আঞ্চলিক পানি বণ্টন নিয়ে চলমান সংকটের সত্যিকার সমাধানের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এ কথাতো জানাই যে জ্বালানির পরিবর্তে আগামী বিশ্বকাঠামোয় বিশুদ্ধ পানির মালিকানা মূল নিয়ন্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। উন্নয়ন অর্থনীতি এ বিষয়টির সমাধান ব্যতীত চলতে পারে না।
সৌজন্যেঃ weeklykota
Facebook Comments
Share This Post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
4 Comments

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *