পৃথিবীতে পানি কোথা থেকে এলো?

পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রায় ৭০ ভাগ পানি দ্বারা বেষ্টিত। পৃথিবীর মোট পানির ৯৭% দ্বারা সমুদ্র গঠিত আর বাকি ৩% দ্বারা নদী, ভূগর্ভস্থ পানি, গ্লেসিয়ার, অন্যান্য সব গঠিত। এই পানি কখনো তরল, কখনো বরফ আবার কখনো বাষ্প হয়েছে আবার সময়কালে বৃষ্টি হয়ে ভূপৃষ্ঠে ঝরে পড়েছে। এভাবে পৃথিবীতে পানির পরিমান সবসময় একই থেকেছে। পানি জীবনের একটা অপরিহার্য উপাদান। পৃথিবী পানিশুন্য হলে হয়তো জীবনের উৎপত্তি সম্ভব হতোনা। কিন্তু জীবনের সমতূল্য এই উপাদানটি সম্পর্কে আমরা কতটুকুই বা জানি! পানি সম্পর্কে সবথেকে প্রথম ও গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্নের উত্তরটাইতো এখনো আমরা সঠিকভাবে জানিনা, যে পৃথিবীতে পানি কোথা থেকে এলো? ধারণা করা হয়, পৃথিবী সৃষ্টি হয় প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর পুর্বে, এবং ৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাসাগর গঠিত হয়। এই মহাসাগর সৃষ্টিতে বিপুল পরিমান পানির প্রয়োজন হয়েছিল। এই বিপুল পরিমান পানি পৃথিবীতে এলো কিভাবে? বিজ্ঞানীদের কাছে এটা খুব গুরুত্বপুর্ণ এক ধাঁধা।

পৃথিবীতে পানির উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে হলে কিছু জিনিস জানা দরকারঃ দুইটা হাইড্রোজেন অনু ও একটি অক্সিজেন অনু মিলে একটি পানির অনু (H2O) গঠন করে। মহাবিস্ফোরণের অল্পকিছুক্ষন পরেই বিগ-ব্যাং থেকে উদ্ভুত কিছু কনা একত্রিত হয়ে প্রথম পরমানু, হাইড্রোজেন (H) গঠন করে কিন্তু অক্সিজেন (O) তৈরি করতে মহাবিশ্ব প্রায় ১ বিলিয়ন বছর সময় নেয়। অক্সিজেন প্রথম তৈরি হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণের (Supernova Explosion) মাধ্যমে। এরপর হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মিলিত হয়ে পানির অনু গঠন করে এবং মহাবিশ্বের ধুলিকনার সাথে মিশে থাকে। বিভিন্ন গ্যালাক্সির নেবুলা পর্যবেক্ষন করেও পানির অনুর অস্তিত্বের সপক্ষে প্রমান মিলেছে, অর্থাৎ মহাবিশ্বে বেশ আগে থেকেই পানি ছিল। তাহলে এটা নিয়ে আর চিন্তা কি? কিছুতো গড়বড়ে ব্যাপার আছেই। সুর্যের চারপাশে আবর্তনরত আন্তঃনাক্ষত্রিক ধুলিকনা (Interstellar Dust) থেকে যখন পৃথিবী সদ্য গঠিত হয়েছিল তখন এর তাপমাত্রা প্রায় সুর্যের তাপমাত্রার সমান ছিল, উপরন্তু বায়ুমন্ডল জাতীয় কোন খোলক ছিলনা। তাই উক্ত ধুলিকনাতে যদি পানি উপস্থিতি থাকতো সেটা বাষ্প হয়ে মহাশুন্যে চলে যাওয়ার কথা। সুতরাং, পানি নিশ্চয় পৃথিবী গঠিত হওয়ার পরে এসেছিল।

পৃথিবীতে পানির উৎপত্তি বা উৎস সম্পর্কে মোটামুটি চারটি ধারনা বেশ জোরাল অবস্থানে আছে।প্রথমত, পৃথিবীতে আছড়ে পড়া গ্রহাণু (Asteroids) বা উল্কাপিন্ডের (Meteorites) সাথে পানির আগমন ঘটেছিল। দ্বিতীয়ত, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পৃথিবীর অভ্যান্তরেই পানি উৎপন্ন হয়েছিল, যেটা পরবর্তিতে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের (Volcanic Eruption) মাধ্যমে বায়ুমন্ডলে বাষ্প আকারে জমা হয় এবং বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। তৃতীয়ত, আন্তঃনক্ষত্রিক ধুলিকনাতে শুরুতেই পানির অনু ছিল, এই ধুলিকনা জড়ো হয়ে পৃথিবী গঠন করে এবং সেখান থেকেই পানির উৎপত্তি। চতুর্থত, ধুমকেতু পৃথিবীতে পানি বয়ে নিয়ে আসে। এই চারটি ধারনার কোনটাই পৃথিবীতে পানির উৎপত্তি সম্পুর্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি যদিও, তবে প্রতিটারই জোরালো ভিত্তি আছে।

এখন প্রশ্ন হলো পানি ধুমকেতু বা গ্রহানুপুঞ্জ যেখান থেকেই আসুক, বুঝবো কি করে ওটাই পৃথিবীতে প্রাপ্ত পানি? হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ডিউটেরিয়াম (হাইড্রোজেন পরমাণু + ১টা অতিরিক্ত নিউট্রন) অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে ভারি পানি (D2O) তৈরি করে। অর্থাৎ, সাধারন পানি থেকে ভারি পানিতে একটা নিউট্রন বেশি থেকে। সাধারন পানি থেকে এটা প্রায় ১০% ভারি। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন সাগরের পানিতে খুব সামান্য পরিমানে ভারি পানি থাকে, প্রায় ৩২০০ পানির অনুতে ১টা ভারি পানির অনু। তাহলে, যেখান থেকে পৃথিবীতে পানি এসেছে সেখানেও নিশ্চয় এই অনুপাতে ভারি পানি পাওয়া যাবে! কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, হ্যালী, হায়াকুতেক এবং হেলবপ ধুমকেতু পর্যবেক্ষন করে জানা গেলো ভারি অনুর অনুপাত সেখানে পৃথিবীর দ্বিগুণ। ফলে ধুমকেতু ধারনা অন্ধকারে ডুব দিলো। সম্প্রতি ২০১১ সালে, মিশিগান ইউনিভার্সিটির টেড বার্লিনের গবেষণা থেকে হার্লে-২ ধুমকেতুতে সমুদ্রের পানির সম-অনুপাতের ভারি পানির অস্তিত্ব মিলেছে, ২০০০ সালের দিকে লিনিয়ার নামের অন্য একটি ধুমকেতুও এরকম তথ্য দিয়েছিল। হার্লে-২ এবং লিনিয়ার উভয় ধূমকেতুর উৎস কুইপার বেল্ট। এইদুটি ধুমকেতুর সাথে পুর্বের ধুমকেতুর ভারি পানি সংক্রান্ত তথ্য না মেলার কারন হয়তো ধুমকেতুগুলোর পৃথক উৎস। তবে, গ্রহাণুপুঞ্জ থেকে আগত উল্কাপিন্ড বিশ্লেষন করে সেখানেও পৃথিবীর অনুরুপ ভারি পানির অস্তিত্ব মিলেছে, তাই এখনো পর্যন্ত উল্কাপিন্ড ধারনাই সবথেকে শক্তপোক্ত ভাবে টিকে আছে।

অতি সম্প্রতি, ২০১৫ সালের নভেম্বরের দিকে একদল গবেষক, কানাডার বাফিন দ্বীপে এক ধরনের পাথর খুজে পান। এই পাথরটি পৃথিবী গঠনের প্রাক্কাল থেকে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর ধরে অবিকৃত অবস্থায় পৃথিবী অভ্যান্তরে রয়ে গেছিল, অগ্নুৎপাতের ফলে উপরে চলে আসে। লিডিয়া হ্যালিস এই পাথরের মধ্যে কিছু কাচ স্ফটিক খুজে পান, যার মধ্যে কিছু পানির অনু আটকা পড়ে ছিল। উক্ত পানি বিশ্লেষন করে দেখা গেছে তা সমুদ্রের পানির অনুরূপ। ওদিকে এপোলো-১৫ ও ১৭ মিশন থেকে প্রাপ্ত চাঁদের পাথরে যে পানি পাওয়া গেছে তাতে ভারি পানির অনুপাত পৃথিবীর অনুরুপ। এই ফলাফল নির্দেশ করছে, আন্তঃনাক্ষত্রিক ধুলিকনাতেই পানির অস্তিত্ব ছিল এবং পৃথিবী গঠনের সময় থেকেই পানির অস্তিত্ব ছিল পৃথিবী গহ্বরে। পরবর্তিতে অগ্নুৎপাতের ফলে পানি পৃথিবী পৃষ্ঠে চলে আসে এবং বায়ুমন্ডলের কারনে পৃথিবীতে আটকা পড়ে। সুতরাং, শুরু থেকেই যদি পৃথিবীতে পানির অস্তিত্ব থেকে থাকে তাইলে ধুমকেতু বা উল্কাপিন্ড থেকে পানির আগমন অপ্রয়োজনীয়!

এখানেও বিতর্ক ওঠে যে লিডিয়া হ্যালিসের বর্ণিত পাথরে আটকা পড়া এই পানি হয়তো পৃথিবী গঠনকালে কোন ধুমকেতু বা উল্কাপিন্ড পৃথিবীতে আছড়ে পড়া কোন ধুমকেতু বা উল্কাপিন্ড থেকে এসেছে! কিন্তু এই পানিতে ভারি পানির অনুপাত সমুদ্রে প্রাপ্ত অনুপাত থেকে ২২% কম যেটা এই বিতর্কের মুখে তুলা গুজে দেয়। কারন ধুমকেত বা উল্কাতে প্রাপ্ত ভারি পানির অনুপাত এর থেকে অনেকগুন বেশি। যাহোক, নিশ্চিত করে বলা যাবেনা পৃথিবীতে পানি কিভাবে এসেছে কিংবা আগে থেকেই ছিল কিনা! হয়তো এর কোনটা ঠিক বাকিগুলো ভুল। আবার এমনো হতে পারে মোট পানির একাংশ পৃথিবীতে ছিল, বাকি অংশ বাইরে থেকে এসেছে।

সৌজন্যেঃ Ape’s Blog

Facebook Comments
Share This Post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *