পানি নিয়ে ভাবনা, আর না!

বছর দুয়েক আগেও চট্টগ্রাম নগরের সবচেয়ে বড় আবাসিক এলাকা হালিশহরের হাউজিং এস্টেটের সুউচ্চ ভবনগুলোর ফ্ল্যাটের বড় অংশ খালি পড়ে থাকতো শুধু সুপেয় পানির অভাবে। ডিপ টিউবওয়েল, সাব-মার্সিবল পাম্প বসিয়েও পর্যাপ্ত পানি না পেয়ে শেষ ভরসা হিসেবে ওয়াসার ভাউজারের পিছনে হাজার হাজার টাকা গুনতে হতো ওই এলাকার বাসিন্দাদের। তবে হালিশহর আবাসিক এলাকার সে সমস্যা এখন নেই বললেই চলে। ২০১৬ সালে ২ নভেম্বর কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-১ চালু হওয়ার পর থেকে যেন পানিতেই ভাসছেন হালিশহর-আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দারা।
 
দুই বছর আগে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সরবরাহ গাড়ি ভাউজারের এত বেশি চাহিদা ছিল যে পানি সরবরাহ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হতো ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে। ১৪০০ টাকায় ১০ হাজার লিটারের এক ভাউজার পানি পেতে ড্রাইভারদের দ্বিগুণ ঘুষ দিয়েও বসে থাকতে হতো ২/৩ দিন। এই ভাউজারের মূল গ্রাহক ছিল হালিশহর আবাসিক এলাকা। সেই ভাউজারের চাহিদা নেই গত দুই বছর ধরে।
 
চট্টগ্রাম ওয়াসার ওয়াটার ওয়ার্কসের সহকারী প্রকৌশলী রফিকুজ্জামান ভাউজারের চাহিদার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘আগের তুলনায় বর্তমানে এক-চতুর্থাংশ চাহিদাও নেই ভাউজারের। আগে যেখানে প্রতিদিন ২০ গাড়ির ওপরে চাহিদা থাকতো সেখানে এখন গড়ে ৪ থেকে ৫টিতে নেমে এসেছে পানির ভাউজারের চাহিদা। কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পটি চালু হওয়ার পর পানির যে তীব্র সংকট ছিল সেটা অনেকাংশে কেটে গেছে।’
 
চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্র জানায়, নগরে পানির চাহিদা বর্তমানে ৫০ কোটি লিটার। ২০১৬ সালে এই চাহিদার বিপরীতে পানি পাওয়া যেত ১৮ থেকে ২০ কোটি লিটার। পানির তীব্র সংকটের মধ্যে ২০২ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২০১৬ সালের ২ নভেম্বর পুরোদমে উত্পাদনে আসে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-১। ১৪ কোটি ৩০ লাখ লিটার উত্পাদন ক্ষমতার এ প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতেই নগরবাসীর চিরকালীন দুঃখের অনেকটা অবসান হয়।
 
সুপেয় পানির হাহাকার কেমন ছিল এর বর্ণনা দিতে গিয়ে হালিশহর জে-ব্লকের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আমার পাঁচতলা ভবনে ১২টি পরিবার থাকে। সেই সময় পানি না পেয়ে শুধু ভাউজারের পেছনেই মাসে কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে যেতো। কিন্তু তাও যথাসময়ে পানি পেতাম না। এমনও হয়েছে টানা দুদিন পুরো ভবনে এক বালতি পানিও নেই। ভাড়া কমিয়েও ভাড়াটে ধরে রাখতে পারতাম না।’
 
যদিও এই পানি পেতে পানির পাইপ বসাতে একাধিকবার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এই এলাকার রাস্তাগুলো অনেকটা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। কিন্তু চলাচলের অসুবিধার পরেও পানি সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন একই এলাকার বাসিন্দা খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ‘পানি ছাড়া জীবন অচল। বিদ্যুৎ, গ্যাস না থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কিন্তু পানির কোনো বিকল্প নেই।’
 
তবে এখনো হালিশহর আবাসিক এলাকার বি-ব্লকের শেষ মাথা এবং চান্দগাঁও, বাকলিয়া, বন্দর ও পতেঙ্গা এলাকায় পানির সংকট রয়েই গেছে। কারণ কর্ণফুলী প্রকল্পের পানিতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল হালিশহর-আগ্রাবাদ এলাকাকে। তবে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে মদুনাঘাট প্রকল্পটি চালু হলে চান্দগাঁও-বাকলিয়া-বন্দর ও পতেঙ্গাবাসী সুপেয় পানি পাবে বলে ওয়াসা সূত্র জানায়। এ মাসেই ৯ কোটি লিটার উত্পাদন ক্ষমতার প্রকল্পটি পরীক্ষামূলক পানি সরবরাহ শুরু করবে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চিটাগাং ওয়াটার সাপ্লাই ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রকল্পের অধীনে বাস্তবায়ন হচ্ছে প্রকল্পটি।
 
এ প্রকল্প চালু হলে চট্টগ্রামের বর্তমান পানির চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ পূরণ হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যত পরিকল্পনার স্বার্থে আমরা যদিও বলি নগরীর পানির চাহিদা ৫০ কোটি লিটার বাস্তবে আসলে চাহিদা আরও কম। এই ৫০ কোটি লিটার দিয়েই আমরা আগামী ১০ বছর চালিয়ে দিতে পারব।’
 
বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃক সরবরাহকৃত ৩০ কোটি লিটার পানির ৯ কোটি লিটার আসে মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে, ৭ কোটি লিটার ডিপ টিউবওয়েল এবং বাকী ১৪ কোটি লিটার আসে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-১ থেকে।
 
এছাড়া ৪ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-২ নামের আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
 
১৪ কোটি ৩০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ ক্ষমতার প্রকল্পটি শেষ হবে আগামী ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে। প্রকল্প অর্থায়নের সিংহভাগের জোগান আসবে জাইকা থেকে। জাইকা নতুন এই প্রকল্পে ৩ হাজার ৬২৩ কোটি টাকার আর্থিক জোগান দেবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের ফান্ড থেকে ৮৪৪ কোটি ৮০ লাখ এবং চট্টগ্রাম ওয়াসা দেবে ২৩ কোটি টাকা। রাঙ্গুনীয়া উপজেলার পোমরায় কর্ণফুলী নদী থেকে উত্তোলিত পানি শোধনের পর ৩০ কিলোমিটার দূরত্বের চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে আসার জন্য পাইপলাইন স্থাপন করা হবে। এজন্য একই প্রকল্পে শহর জুড়ে ৬১৭ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো হবে বলে ওয়াসা সূত্র নিশ্চিত করেছে।
 
চট্টগ্রামের পানি সরবরাহ লাইনের বেশির ভাগ ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরনো। ফলে প্রায়ই পানির একটু চাপ বাড়ালে কোথাও না কোথাও পাইপ লিকেজের ঘটনা ঘটে।
 
এ কারণে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-২ এর প্যাকেজ-২ এ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৬১৭ কিলোমিটার সরবরাহ পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে।
 
চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না জিও ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিজিইসি) পাইপলাইনের কাজটি বাস্তবায়ন করবে।-কালের কণ্ঠ
Facebook Comments
Share This Post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *