পানি দুষণরোধে সমন্বিত গবেষণা

” বৃষ্টি, ভূপরিস্থ অথবা ভূগর্ভস্থ সবরকম পানির ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় সহজপ্রাপ্যতার জন্য টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজন, যার দায়িত্ব সবাইকে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে অবশ্যই কাঁধে নিতে হবে। পানি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব প্রধানত তাই ব্যবহারকারীদের ওপর বর্তায়। সবার অংশগ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করে পানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত জোরালোভাবে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। “

বাংলাদেশের জীবনধারা পানিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে; পানি এদেশের জনগণের কল্যাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পানি অতি নাজুক এক প্রাকৃতিক পরিবেশকে সংরক্ষণ এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ করতে সহায়তা করছে। দুর্ভাগ্যবশত পানি একটি সীমিত সম্পদ এবং কোনোক্রমেই প্রকৃতির অন্তহীন দান হিসেবে পানির যথেচ্ছ ব্যবহারের অবকাশ নেই। পানির একক বৈশিষ্ট্যের কারণে এর যে কোনো ব্যবহার অন্য ব্যবহারকে প্রভাবিত করে। জীবনধারণের জন্য পানির প্রাপ্যতা, পরিমাণগত ও গুণগত উভয় বিচারেই, একটি মৌলিক মানবাধিকার। তাই সমাজের কোনো অংশের স্বার্থ বিঘি্নত না করে পানির যথার্থ ও সুষম ব্যবহারের নিশ্চয়তা বিধান একান্ত কাম্য।
বৃষ্টি, ভূপরিস্থ অথবা ভূগর্ভস্থ সবরকম পানির ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় সহজপ্রাপ্যতার জন্য টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজন, যার দায়িত্ব সবাইকে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে অবশ্যই কাঁধে নিতে হবে। পানি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব প্রধানত তাই ব্যবহারকারীদের ওপর বর্তায়। সবার অংশগ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করে পানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত জোরালোভাবে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। পানি সম্পদের উন্নয়নে অবশ্য সাধারণত বড় ধরনের নিবিড় মূলধনী বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে এবং বাস্তবেও মাত্রাভিত্তিক আর্থিক সুবিধাদি সৃষ্টি হয় যার ফলে এ খাতে সরকারি বিনিয়োগের আবশ্যিকতা যুক্তিযুক্ত হয়ে ওঠে। সমাজের সামগ্রিক চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও মানব সম্পদ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও পরিবেশগত দিক সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কারণে সরকারের ভূমিকা আজ তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পানি সংক্রান্ত বহু সমস্যা ও অনিষ্পন্ন বিষয়াদি সমাধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা আজ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে সবচেয়ে সঙ্কটপূর্ণ হচ্ছে পর্যায়ক্রমিক বর্ষাকালে বন্যা ও শুকনো মৌসুমে পানির দুষপ্রাপ্যতা, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি ও জনসংখ্যার কারণে পানির ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা, নদ নদীতে ব্যাপক পলিমাটি পড়ে ভরাট হওয়া এবং নদীভাঙন। লবণাক্ততা, ভূপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির মানের ক্রমাবনতি ও পানি দূষণসহ পানির সামগ্রিক গুণগত মানের ব্যবস্থাপনা এবং ভৌত ও জৈব পরিবেশ ব্যবস্থা সংরক্ষণের প্রয়োজন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উলি্লখিত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পানি সম্পদের উন্নয়ন এবং তার যুক্তিসঙ্গত ব্যবহারের ব্যাপকভিত্তিক নীতিমালা এ জাতীয় পানি নীতিতে বিধৃত হয়েছে। বৃহত্তর সমাজ ও ব্যক্তির কল্যাণের লক্ষ্যে পানি সম্পদের সর্বোত্তম উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিরূপণে এ নীতিমালা দিক নির্দেশনা প্রদান করবে।

জাতীয় পানি নীতি ঘোষণা : যেহেতু মানুষের জীবনধারণ, দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পানি একান্ত প্রয়োজনীয়, সে কারণে ব্যাপক, সমন্বিত ও সুষম ভিত্তিতে দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব পদ্ধতি ও কার্যক্রম গ্রহণ করাই সরকারের নীতি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচন, খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা, জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, জনগণের উন্নততর জীবনমান এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষার যাবতীয় লক্ষ্যসমূহ পরিপূরণের উদ্দেশে নিরবচ্ছিন্ন অগ্রযাত্রার জন্য এ নীতিমালা রচিত হয়েছে।

জাতীয় পানি নীতি পর্যাবৃত্তে পরীক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুসারে সংশোধন করা হবে। এ নীতি দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দিক-নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। পানি সম্পদের উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, পানি সরবরাহ ও পানি সংক্রান্ত সেবাসমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, সংস্থা, বিভাগ ও স্থানীয় সংস্থাসহ বেসরকারি ব্যবহারকারী ও উদ্যোক্তা এ নীতি থেকে দিক-নির্দেশনা গ্রহণ করবে।

জাতীয় পানি নীতির উদ্দেশ্যসমূহ : পানি খাতে কর্মরত সব সংস্থা ও যে কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনে দিকনির্দেশনা দেয়া পানি নীতি প্রণয়নের লক্ষ্য। সাধারণভাবে পানি নীতির উদ্দেশ্যসমূহ হচ্ছে-

ক. ভূপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ সব ধরনের পানির উন্নয়ন ও ব্যবহার এবং এ সব সম্পদের দক্ষ ও সুষম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সম্পর্কে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।খ. দরিদ্র ও অনগ্রসর অংশসহ সমাজের সবার জন্য পানিপ্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ এবং নারী ও শিশুদের বিশেষ প্রয়োজনের প্রতি মনোযোগ দেয়া।
গ. পানি ব্যবহারের অধিকার নিরূপণ ও পানি মূল্য নির্ধারণসহ উপযুক্ত আইনগত, আর্থিক এবং উৎসাহমূলক ব্যবস্থাদি গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি পানি সরবরাহ পদ্ধতির টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।
ঘ. পানি ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণ এবং পানি ব্যবস্থাপনায় নারীর ভূমিকা বর্ধিত করার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন সাধন।
ঙ. বিকেন্দ্রীকরণ ও সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া এবং পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাতে অনুকূল বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিকাশের লক্ষ্যে একটি আইনগত ও নিয়ন্ত্রণমূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা।

লেখকঃ সরফরাজ নেওয়াজ

Facebook Comments
Share This Post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *