পানি জীবনের জন্য জীবিকার জন্য : সিঙ্গাপুর অভিজ্ঞতা

পানি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য অভিন্ন একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। পানিবিহীন বর্তমান, ভবিষ্যৎ অকল্পনীয়। দেশে দেশে, জনপদে জনপদে পানির সংকট জীবনকে বিপন্ন করে। বিপর্যস্ত করে, বিলীন করে। জনসংখ্যার ঘনত্বের সাথে পানির ব্যবহার ও বিপণনের প্রবৃদ্ধি ঘটে। পানি সংকট অন্যান্য সংকটকে প্রভাবিত করে। জীবনকে বিপদাপন্ন করে তুলে। বাংলাদেশের মতো জনসংখ্যার ঘনত্বের জনপদে পানিকে সংকট মনে করার প্রবণতা ও তাড়না নিবিড় নয়। পানি ব্যবহারে আমরা এখনো কোনো মানে পৌঁছাতে পারিনি। পানি ব্যবহারে অনিয়ম, অদূরদর্শিতা, অমনোযোগিতা, অপরিণামদর্শিতা আমাদের চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এভাবে পানির প্রতি নির্লিপ্ততা আমাদের ভবিষ্যতের প্রতি নির্লিপ্ততাকে ছুঁয়ে যায়। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন খাবার জন্য সুপেয় পানি পায় না।
 
পৃথিবীর একটিমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে দেশে দেশে অব্যবস্থাপনা আছে। আছে বণ্টনে অসমতা, অনিয়ম, অদক্ষতা। শ্রেণিভেদে পানি ব্যবহারে দেশে দেশে আছে অসাম্য, অসমতা, অনিয়ম। প্রত্যেক দেশে মানুষের পানি ব্যবহারের একটি মৌলিক বৈশ্বিক নীতি-রীতি থাকা দরকার। বিশেষ করে ঘন জনবসতির জনপদে। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের অভিজাত এলাকাগুলো পানি ব্যবহারে অনিয়ম চর্চা করে। বস্তির মানুষের প্রতিদিনের পানি ব্যবহারের সাথে অভিজাত অঞ্চলের প্রতি জনের প্রতি দিনের পানি ব্যবহারের পরিমাণের ফারাক অনেক। সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া সবার জন্য নিরাপদ, সুপেয় এবং স্যানিটেশন পানি নিশ্চিত করেছে অনেক আগেই। তারা প্রথম লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে ‘মাথাপিছু পানির ব্যবহার কীভাবে কমিয়ে আনা যায়’। পানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী, পানি অপচয়ে মিতব্যয়ী, পানি পুনর্ব্যবহারে প্রযুক্তি নির্ভরতা প্রভৃতি পানি বিষয়ক কার্যক্রম তারা প্রতিদিন আপডেট করছে।
 
সিঙ্গাপুর ব্যবহার্য পানি পাশের দেশ থেকে আমদানি করতো। তা তারা কমিয়ে এনে স্বনির্ভর হচ্ছে। ডিসেলাইনেশন প্রযুক্তিতে পরিবর্তন আনছে। স্বল্প আয়তনের ঘনবসতির এককেন্দ্রিক শহর রাষ্ট্রের মৌলিক চাহিদাগুলোর অন্যতম পানি। ধোয়া মোছা থেকে শুরু করে গৃহস্থালি, অফিস, আদালত, হোটেল, মোটেল, শিল্পবাণিজ্য, রিক্রিয়েশন, রিফ্রেশমেন্ট সর্বপ্রকার কার্যক্রমে পানির ব্যবহারকে সীমিত, সাশ্রয়ী, সচেতন, সংঘবদ্ধভাবে ব্যবহারের তাড়না নাগরিক ও ভ্রমণবিলাসীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
 
একজন পর্যটক সিঙ্গাপুরে অবতরণ করেই যে বিষয়টির প্রতি মনোযোগী হবেন, তা হলো পরিচ্ছন্নতা এবং পানি ব্যবহারে সচেতনতা। বাথরুম, টয়লেট ওয়ানস্টপ। একাধিক টেপ শাওয়ার থেকে মানুষ সরে এসেছে। অভ্যস্ত হয়েছে। তারা প্রতিদিন অভ্যস্ত হচ্ছে। বহুমাত্রিক সাশ্রয়ী সরঞ্জাম, ফিটিংস বাথরুমের জন্য তারা সরবরাহ করছে। উদ্দেশ্য একটিই। পানি ব্যবহার জনসংখ্যা ও উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির সাথে কমিয়ে আনা। তারা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, ২০৩০ সালের ভিতর মাথাপিছু প্রতিদিন পানির ব্যবহারকে ১৪০লিটারে নামিয়ে আনবে। এজন্য তদারকি আছে মোটিভেশন প্রক্রিয়া আছে। আছে আইনের প্রয়োগ।
 
যেখানে বাংলাদেশের মতো জনপদের শহরাঞ্চলে পানি ব্যবহারে সিস্টেম লসের পরিমাণ ৩৫-৪০% সেখানে সিঙ্গাপুরে তা ৫% এর বেশি নয়। বিভিন্ন ধর্মের বোধ ও নৈতিকতায় পানিকে সাশ্রয়ী ব্যবহারে নীতিকথা আছে। পানিকে অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া আছে পানির প্রাচুর্য থাকার সময় থেকে। পানির অপর নাম জীবন রাখা হয়েছে অনেক দিন আগে। কিন্তু সবকিছুর পরও পানি ব্যবহারে সচেতনতা আমাদের তাড়নাকে তাড়িত করতে ব্যর্থ হয়েছে বার বার। আমরা পানি নষ্ট করি। অপচয় করি, এটি আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ। শতভাগ সংকটাবর্তিত হলেও সংকট আমাদের তাড়িত করে না। আমরা অবশ্যই মাত্রিকতা বাদে তাড়িত হই কিন্তু নিজের ভিতর তা ধারণ করি না। আসলে আমরা চেতনায় পরিপক্ক নই। পরিপূর্ণ নই, পরিপৃক্ত নই। সিঙ্গাপুর একটি নগর রাষ্ট্র। দ্বীপ রাষ্ট্র। সীমিত ভূখণ্ডের উন্নত দেশ। ঘন জনবসতিতে প্রথম বিশ্বে। প্রাকৃতিক সম্পদ তেমন নেই, পারিপার্শ্বিক সম্পদ পূর্ণ।
 
উন্মুক্ত বিশ্ববাণিজ্যের সূতিকাগার ব্যবসা-বাণিজ্যের আন্তর্জাতিকতায়পূর্ণ, সম্পদের সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার একটি দেশ। আইন আছে। প্রয়োগ আছে। জবাবদিহিতা আছে। জনগণের আইন মানার বাধ্যবাধকতা আছে। আইন মানার সুফল জনগণ পর্যটক সবাই ভোগ করে। তৃপ্ত হয়। সিঙ্গাপুরকে ফাইন সিটি বলে অভিহিত করা হয়। এ ফাইন দ্ব্যর্থক। একটি হলো সুন্দর পরিচ্ছন্ন। অন্যটি হলো জরিমানা। অনিয়ম করলে জরিমানা। অপচয় শব্দটিকে তারা বর্জন করে চলতে চেষ্টা করে। আইন এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়। জনগণ আইন মানতে অভ্যস্ত। আইন মেনে তারা সুফল ও সেবা পায়। সেবা সবার মাঝে উন্মুক্ত বণ্টন হয়। দেশ এমনিভাবে এগিয়ে যায়। সবুজের ছোঁয়ার ঘাটতি থাকলেও তারা থেমে থাকেনি। সবুজকে কৃত্রিমতায় পরিবর্তন করে তারা বিশ্ব সম্প্রদায়কে আকৃষ্ট করে ধরে রেখেছে। বিশ্বের মানুষের চাহিদাকে সংঘবদ্ধ করে তারা পরিকল্পনা করে। সীমিত পরিসরের ভাসমান দেশে তারা প্রতিক্ষণে পরিপার্শ্বকে ঢেলে সাজায়। তাদের তাড়নায় পর্যটক শ্রেণি আকৃষ্ট হয়। তাদের সততায় বিশ্বের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ব্যাংক-বীমায় আকৃষ্ট হয়। বিনিয়োগ আসে। অবকাঠামো বিনির্মাণ হয়। পর্যটক ও বিশ্ব ব্যবস্থাকে আকৃষ্ট করে নিজেদের কব্জিতে নিয়ে আসাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
 
১৯৬৫ সালে মুক্ত, স্বাধীন সত্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করে পঞ্চাশ বছরে তারা বিশ্বকে নাড়িয়েছে। জনগণের জন্য জনসেবাসমূহকে উন্মুক্ত করে দিয়ে তারা নজির স্থাপন করেছে। একটি পাসপোর্ট করতে সে দেশে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লাগে, তারা তো এগিয়ে থাকবেই। প্রত্যাশার চেয়েও এগিয়ে তারা। মাত্র ১৩৩ বর্গকিলোমিটারের ভূখণ্ড প্রতি বর্গ কিলোমিটারে সাড়ে সাত হাজার মানুষ বাস করে। এ থেকে আমাদের শিক্ষণীয় যা আছে, তা আমরা আজো যথার্থভাবে গ্রহণ করিনি। এই সিঙ্গাপুর ২০০৩ সালে মাথাপিছু পানি ব্যবহার করতো ১৬৫ লি. প্রতিদিন। তারা তা ২০৩০ সালে প্রতি জনে প্রতিদিন ১৪০লি. এ নামিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছে।
 
এ জন্য তারা পরিবেশ ও পানি শিল্প উন্নয়ন সংস্থা বা (ঊডও) প্রতিষ্ঠা করে কাজ করে যাচ্ছে। দেশটিতে প্রায় ৭০টি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ২৩টি গবেষণা ও উন্নয়ন গ্রুপের আওতায় কাজ করে যাচ্ছে। শুধু পানির চাহিদাকে হালনাগাদ করে জনগণের জনসম্পদের প্রবৃদ্ধিকে মোকাবেলা করতে। এ দেশটিতে পানি পান ও ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা হয় মাত্রামত। হোটেলগুলোতে প্রায়ই অপচয় রোধ করতে পরামর্শ ও সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। ওয়াশরুম ও টয়লেটগুলোতে এমন ফ্লাস ও টেপ সংযোগ করা হচ্ছে যে, চাইলেই পানি অপচয় করা যাবে না। ওরা লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চলে। আমরা মুখস্থ চলি। ওদের চলার সিলেবাস ও উদ্দেশ্য আছে। আমরা লক্ষ্যহীন চলি। সিলেবাস ছাড়া চলি। মিঠা পানির ঊর্বর ভূখণ্ডের মানুষ হয়েও আমরা পানির সংকটের দিকে দ্রুত ধাবমান হচ্ছি।
 
আমরা সংকটকে সংকট মনে করার মানসিকতাই পালন করি না। আমাদের পানি অপচয়ের শেষ হবে পানি শেষ হওয়া অব্দি। আমরা আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত পানি শেষ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত পানিতে টান দিয়েছি অনেক আগেই। আমরা কি জাগবো না? কবে সে জাগরণ? আসুন, চোখ খুলে চারিদিকে তাকাই। সংকটাপন্ন ভবিষ্যতকে দেখার চেষ্টা করি। আজকের সুচিন্তিত পদক্ষেপ আগামীর জন্য সুরক্ষা হতে পারে।
 
লেখক : মুহাম্মদ ইদ্রিস আলি
মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক

Facebook Comments
Share This Post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *