পানি ও প্রাকৃতিক শক্তির জন্য চাহিদা আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য চ্যালেঞ্জ

জীবন রক্ষাকারী সুপেয় পানি ও নদী সম্পর্কে আজকাল অনেকেই অনেক প্রবন্ধ/নিবন্ধ পত্রপত্রিকায় লিখছেন কিন্তু বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা বিআইডব্লিউটিএ ১৯৬২-৬৭ সনের হিসেব মতে ২৩০টি ছিল যা ১৯৭৫ সনে প্রকাশিত Bangladesh Water Mileage Table GI ২৩০টি নদীর নাম উল্লেখ আছে। কিন্তু ২০০৪ সনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের নদ-নদী নামক গ্রন্থে ৩১০টি নদীর নাম উল্লেখ আছে কিন্তু ২০১৩ সনে CEGIS কর্তৃক ৪০৫টি নদীর নাম আবিষ্কার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে অন্য কোন সংস্থা হতে আর কোন ব্যতিক্রমধর্মী তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জীবন রক্ষাকারী পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি মানুষের তৃষ্ণা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত প্রতিটি দেশ-জাতি পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম বণ্টন বা ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না। যদি আমরা মধ্য-প্রাচ্যের সুদীর্ঘ সঙ্ঘাতের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে, অনেকগুলোই পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণেই ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের ডন্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক পানি আইন বিষয়ক প্রফেসার পেট্রিসিয়া উটার মনে করেন যে, পানির দুষ্প্রাপ্যতা এখন গ্লোবাল এজেন্ডা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। তিনি মত প্রকাশ করেন যে, মধ্য প্রাচ্যে বিদ্যমান সংঘাত-সহিংসতা পানির জন্য আরও বেশী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আগামী ২০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যেই চীন ও ভারতসহ উদীয়মান অর্থনীতিতে পানির জন্য চাহিদা সরবরাহের চেয়ে বেশী হবে। যদিও সবচেয়ে ঘনবসতী দেশ চীন বিশ্বের ৪র্থ বৃহত্তম সুপেয় পানি সংরক্ষণ করে, কিন্তু এর মাথাপিছু পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে ২য় ক্ষুদ্রতম। বিশেষজ্ঞরা অনুভব করছেন যে, দ্রুত উন্নয়নশীল চীন (পৃথিবীর ২য় বৃহত্তম অর্থনীতি সমৃদ্ধ) কার্যকরীভাবে পানির দুষ্প্রাপ্যতায় ভুগছে যার কারণে তাদের অর্থনীতির সমৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। অপরদিকে ভারতের পানির চাহিদা দ্বিগুণ হতে পারে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১.৪ ট্রিলিয়ন ঘন মিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে। পাকিস্তানও প্রতি বছর মাথাপিছু মাত্র ১০০০ ঘন মিটার সুপেয় পানি নিয়ে মহা সঙ্কটে পড়েছে। প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, পৃথিবীর ৪০% ভাগ জনসংখ্যা এবং ১৪৫টি দেশ ২৬৩টি আন্তর্জাতিক নদীর জলাধারে (ৎরাবৎ নধংরহ) পড়েছে যা বিশ্বের ৬০% নদীর প্রবাহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিশ্ব ব্যাংক বলে যে, ২০৩৫ সালের মধ্যে এনার্জির জন্য পানির ব্যবহার ৮৫% ভাগের বেশী হবে যখন এনার্জির ব্যবহার ৩৫% ভাগ বৃদ্ধি পাবে। ২০১৩ সালে প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সির বিশ্ব এনার্জি দৃষ্টিভঙ্গি পানির ওপর একটি সেকশন অন্তর্ভূক্ত করেছে, এবং সতর্ক করেছে যে, পানি স্বল্পতা প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিদ্যমান অপারেশন ও উপযোগিতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, এনার্জির বিকল্প আছে কিন্তু পানির কোন বিকল্প নেই। যেহেতু জীবনের অপরিহার্য বস্তু হচ্ছে সুপেয় পানি তাই প্রাকৃতিকভাবেই এটি শক্তির অন্যতম উৎস হিসেবে পরিগনিত হয়েছে। Inter Action Council নামের একটি সংস্থার মতে প্রতি বছর সারা পৃথিবীর হ্রদ, নদী, জলাশয়, জলাধার হতে প্রায় ৩,৮০০ ঘন কিলমিটার সুপেয় পানি ব্যবহার করা হয়। ২০২৫ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ১০০ বিলিয়ন (১০০০ কোটি) হতে পারে এবং এই বিশাল জনসংখ্যার খাদ্যের জন্য প্রতি বছর কৃষিতেই অতিরিক্ত ১০০০ ঘন কিলোমিটার পানির প্রয়োজন হবে যা ২০টি নীল নদীর বার্ষিক প্রবাহের সমান। বিশ্ব ব্যাঙ্ক সোর্স হতে জানা যায় যে, বিশ্বের ৭০% ভাগ ফ্রেশ ওয়টারই কৃষি কাজে ব্যবহার হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এনার্জি শিল্প ও শহুরে ব্যবস্থাপনার জন্য আরও পানির প্রয়োজন হবে। প্রখ্যাত বিশ্ব নেতারা সতর্ক করেছেন যে, অনেক উন্নয়ন দেশেই পানি সংকট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শিতিশীলতাকে হুমকীর মধ্যে রাখছে-যাহোক আশাবাদী মহান নেতৃবৃন্দ বিশ্বাস করেন যে, পানি নিয়ে সঙ্ঘাতের পরিবর্তে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সহমর্মীতার প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আন্তঃনদীর সীমা দ্বারা সংযুক্ত যার অধিকাংশই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; ভারত ও পাকিস্তান সিন্ধু নদীর পানি বন্টন চুক্তি করেছে এবং ভারত ও বাংলাদেশ গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী সম্পর্কে চুক্তি করেছে। নেপাল ও ভারত কোশী, মহাকালী এবং অন্যান্য অনেক নদীর চুক্তি করেছে-পাকিস্তান ও আফগানিস্তান কাবুল নদীসহ মোট ৯টি নদীর পানি বন্টনের চুক্তিবদ্ধ; ইরানের ৪০টির বেশী নদীর উপনদী (ঞৎরনঁঃড়ৎু) ও ক্রসিং ইরাকের সাথে রয়েছে।
আবার তুরস্ক তাইগ্রীস ও ইউফ্রেটিস নদীর ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার ১০টি বৃহৎ নদীর মধ্যে ৯টিই তিব্বত হতে প্রবাহিত হচ্ছে; উৎপাদনের জন্য এনার্জিসহ নবায়নযোগ্য সমস্ত প্রাকৃতিক শক্তির (ঊহবৎমু) জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন। ভারতের দুর্বল পানি ব্যবহার সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য সমালোচিত হচ্ছে। ২০১৩ সনে মহারাষ্ট্রের ১১৩০ মেগাওয়াট থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট পানির অভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সোলার এনার্জি জেনারেশন প্ল্যান্টও বিশাল পানির ব্যবহার প্র্যজন। সুপেয় পানির সরবরাহের অভাবে বিশ্বের অনেক দেশেই এনার্জি জেনারেশন ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের ওয়াটার ইন্সটিটিউটের সিনিয়ার অর্থনীতিবিদ Mr. Diego Rodriguez বলেন যে, যুক্ত্রাষ্ট্রের কয়েকটি পাওয়ার প্লান্টকে স্বল্প পানি প্রবাহের কারণে পুনঃস্থাপন করতে হয়েছে; ফ্রান্সেও পরমাণু শক্তি ও জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন হ্রাস করতে হয়েছে। শ্রীলংকা, চীন এবং ব্রাজিলকেও খড়ার কারণে উৎপাদন হ্রাস করতে হয়েছে। আগামী দিনের ভয়াবহ চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করতে হলে প্রতিবেশী দেশগুলোকে আবশ্যিকভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে কারণ সার্বিক উন্নয়ন ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সহমর্মীতার কোন বিকল্প নেই।
লেখক : মোঃ এমদাদুল হক (বাদশা)
নদী গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাবেক পরিচালক বিআইডব্লিউটিএ
Facebook Comments
Share This Post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *