পানি অধিকার ও সকলের উদ্যোগ

সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা বিধানের কথা বলা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে বিভিন্ন সেবা প্রদানের মধ্যে পানি একটি অন্যতম সেবা খাত। কিন্তু এই খাতের উন্নয়নে যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা সত্ত্বেও অগ্রগতির মাপকাঠি একেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একেক রকম। পানি খাত মানুষের মৌলিক অধিকারের খাত হিসেবে চিহ্নিত হলেও এটাকে কিভাবে দৃশ্যমান করা যায় সে বিষয়ে বহু আলোচনা, সভা, সেমিনার ও জরিপ করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং এই খাতের উন্নয়নসহ সেবা কার্যক্রমের জন্যে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও অনেক সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে।

 

বিশ্বের ৩০ ভাগ স্থল এলাকা ও ৭০ ভাগ পানি। এর মাত্র ৩ শতাংশ মিষ্টি পানি (খাবার, পারিবারিক বিভিন্ন কাজ, কৃষি কাজ ও শিল্প খাতে উপযোগী) এবং বাকি ৯৭ শতাংশ লোনা পানি। সুপেয় এবং নিরাপদ পানির জন্য সারা বিশ্বেই হাহাকার এবং সম্ভবত সে কারণেই বলা হয় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পানির কারণেই হবে। এরকম পরিস্থিতিতে পানির অধিকার সংরক্ষণে আজ বিশ্বব্যাপী সকলেই সোচ্চার। সেক্ষেত্রে আমরাও বেশ উদ্বিগ্ন। সাম্প্রতিক মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাষ্টার সার্ভে (MICS) ২০১২-১৩ এর বরাত দিয়ে বলা যায়, গ্রামের ৯৮ শতাংশ মানুষ পানি সুবিধার আওতায় রয়েছে, যদিও নিরাপদ পানি প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে নানা মতবিরোধ রয়েছে।

 

এই নদীমাতৃক দেশে আমরা সত্তর দশক থেকেই ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। টিউবওয়েল হচ্ছে আমাদের একমাত্র উত্স। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ২০ শতাংশ টিউবওয়েলে আর্সেনিক বিদ্যমান এবং সেই হিসেবে প্রকৃত নিরাপদ পানির আওতায় মাত্র ৭৮ শতাংশ মানুষ। অর্থাত্ পরিসংখ্যানের হিসেবে এখনও বিশাল একটা অংশ নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে এবং পানির সংকটাপন্ন এলাকার পানির প্রাপ্যতা সাপেক্ষে পানি আইন ২০১৩তে সুপেয় পানির উত্স হিসেবে দীঘি, পুকুর বা অনুরূপ কোনো জলাধার সংরক্ষণের বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পানির পারিবারিক ব্যবহারে মহিলারাই প্রধানত পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে এবং দিনের একটি বড় অংশ পানি সংগ্রহে ব্যয় হয়। সুপেয় বা নিরাপদ পানি প্রাপ্যতা এখনও দেশের কোথাও কোথাও মরীচিকা। এঅবস্থায়, নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও সকলের জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন উন্নয়নে সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার।

 

একদিকে পানির অপর নাম জীবন অন্যদিকে পানিবাহিত রোগের ফলে মৃত্যুর কারণও মানুষকে আজকাল ভাবায়। তবুও পানিই জীবন এবং বিশুদ্ধ পানি পাওয়া আমাদের জন্মগত অধিকার। বাংলাদেশ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় (২০১০-২১) সকলের জন্য নিরাপদ খাবার পানি, উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা ও স্বাস্থ্যসম্মত আচরণ নিশ্চিতকরণ অগ্রাধিকারভুক্ত। জনগণের পানি সরবরাহ সেবা সুবিধা প্রাপ্তিতে সহযোগিতা প্রদানকে সরকার টেকসই জাতীয় উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে। এ ছাড়াও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গিকারসমূহ পূরণের অংশ হিসেবে সরকার জাতিসংঘে ২০১৫ সন পরবর্তী উন্নয়ন কার্যক্রম (২০১৬-৩০) পেশ করেছে, যার লক্ষ্য হলো ‘সকলের জন্য নিরাপদ ও টেকসই স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসম্মত আচরণ ও পানি সরবরাহ’। এরই অংশ হিসেবে সেবা-সুবিধা আরও উন্নতিকল্পে সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় আইন-কানুন, নীতিমালা, কৌশলপত্র ও পরিকল্পনা প্রণয়নে উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

 

পানি প্রাপ্যতাও প্রবেশগম্যতায় আমাদের অবস্থান ভালো থাকলেও পানির গুণগত মান বা বিশুদ্ধতায় আমরা বেশ ঝুঁকিতে রয়েছি। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে সুপেয় পানির সুযোগ বঞ্চিত জনসংখ্যার দিক দিয়ে আমাদের অবস্থান বিশ্বের সপ্তম।

 

পানির গুণগত মান যে শুধু রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণেই এটা হয়ে যায় তা নয়। পানি লভ্যতা এবং ব্যবহারের ফলেও দূষিত হয়। যেমন পুকুরের পানিতে আর্সেনিক মাত্রাতিরিক্ত নয় কিন্তু পুকুরের পানি আবার পানযোগ্য নয়। একই সাথে বৃষ্টির পানি যে কলসিতে ধরে রাখা হয়, তা যদি প্রক্রিয়াগতভাবে পরিষ্কার না থাকে তাহলে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে। ফলে পানি দূষিত হতে পারে।

 

পল্লি অঞ্চলের পানির প্রাপ্যতা চিন্তা করলে অবশ্যই প্রথমে টিউবওয়েলের কথা মাথায় আসে। আবার বেশ কিছু বছর ধরে পানি বোতলজাত অবস্থায়ও পাচ্ছি এবং ক্রয় করে পান করছি। টিউবওয়েলের মাধ্যমে প্রাপ্য সুপেয় পানির মূল্য যদি আমরা বোতলজাত পানির মূল্যের সাথে তুলনা করি তাহলে দেখতে পাই দৈনিক একজন মানুষের ২০০ লিটার পানির চাহিদার মধ্যে ১০-১৫ লিটার যদি পানের জন্য প্রয়োজন হয় তাহলে এর সমপরিমাণ বোতলজাত পানির মূল্য দাঁড়ায় ১শ’ ৮০ থেকে ২শ’ ৭০ টাকা (১৮ টাকা প্রতি লিটার পানির মূল্য)।

 

তাহলে সুপেয় পানির মূল্য দিতে পারছি না বলে সম্পূর্ণ নিরাপদ পানি পাচ্ছি না? আবার সরাসরি মূল্য প্রদান না করলেও কি পরোক্ষভাবে মূল্য দিচ্ছি না? পানি অধিকার নিয়ে বিশ্লেষণ না হওয়ায়, পানির গুণগত মান ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে পদক্ষেপের মাধ্যমে পানি অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখবে। জনগণের অংশগ্রহণ এবং সরবরাহ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের আলোচনায় অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। বিশেষ করে শহর ও গ্রাম পর্যায়ে পানি অধিকার বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারকে এ বিষয়ে আরো উদ্দোগী কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
লেখকঃ মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান
উন্নয়ন গবেষক

Facebook Comments
Share This Post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *