জলাবদ্ধতা ও নাগরিকদের দায়িত্ব

bdj
রাজধানী ঢাকার যতগুলো সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো জলাবদ্ধতা সমস্যা। এটিকে সমস্যা বললে ভুল হবে, বলা চলে মহাসমস্যা। প্রতিবছর রাজধানীতে বর্ষার সময় জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। এবারো এর ব্যতিক্রম হয়নি। জলাবদ্ধতায় জনভোগান্তি চরমে পৌঁছায়, পত্রিকায় লেখালেখি হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেন, বলা হয় আগামী বছর আর এমন হবে না, এটুকুই! বাস্তবতা হলো প্রতিবছর জলাবদ্ধতা বাড়ছে।

 

মূলত চারটি নদী— বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা দ্বারা ঢাকা পরিবেষ্টিত।  ঢাকা শহরে অবস্থিত ছোট ছোট খাল ও নালা দিয়ে পানি মূলত এই নদীগুলোতে গিয়ে পড়ে। কিন্তু ঢাকা শহরের নদী ও খাল দিনে দিনে দখল হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা মারাত্মক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। পুকুর, জলাশয়, খাল ও দিঘির মতো এমন প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আমরা দিনে দিনে নষ্ট করে ফেলেছি। ঢাকা ওয়াসার তথ্যমতে, ঢাকার ভেতরে ৫০টি খালের মধ্যে ২৬টি কোনোরকমে টিকে আছে। এগুলোরও আবার যায় যায় অবস্থা।  উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সরকারি তথ্যমতে ৬০ ফুট প্রশস্ত বাসাবো খাল এখন ৩০ ফুট, রামচন্দ্রপুর খাল ১০০ ফুটের বদলে ৬০ ফুট, মহাখালী খাল ৬০ ফুটের বদলে ৩০ ফুট, রূপনগর খাল ৬০ ফুটের স্থলে ২৫ ফুট  হয়ে গেছে।  মূলত উন্নয়নের নামে রাজধানীর খালগুলোকে নালায় পরিণত করা হয়েছে। অনেক খালের দখল ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।  মাঝে মাঝে খালগুলো সংস্কার করা হলেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালগুলো পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।

 

ঢাকা শহরটা মূলত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত, আর এর পূর্ব-পশ্চিমে জলাশয়। আগে অতিবৃষ্টিতে চারপাশের  নদ-নদী ছাপিয়ে শহরে পানি ঢুকতো। এ সমস্যা শহররক্ষা বাঁধ দিয়ে নিরসন করা গেলেও এখন অপরিকল্পিত আবাসন ও ভূমি ব্যবহারে জলাধারগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে কার্যত পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে। খালের ওপর অপরিকল্পিতভাবে কালভার্ট তৈরি করে খালের প্রবাহ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।  আর প্রভাবশালী মহল খাল দখল করে স্বার্থ হাসিল করে চলেছে। উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যায় ঢাকার একাংশ ডুবে যাওয়ার পর  ‘ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রণয়ন করা হয়েছিল।  ২০১০ সালে করা হলো ‘ড্যাপ’ (ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান)। এ দুটি পরিকল্পনাতেই ঢাকা মহানগরীতে পাঁচ হাজার ৪২৩ একর জায়গা জলাধার হিসেবে বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। খাল-নদী রাখার কথা ২০ হাজার ৯৩ একর। বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল সংরক্ষণ করার কথা ৭৪ হাজার ৫৯৮ একর। প্রায় দুই কোটি মানুষের নগরীকে এগুলো ছাড়া বাঁচানো সম্ভব নয়। কিন্তু কোথায় এসব পরিকল্পনা? পর্যাপ্ত জলাশয় বা লেক না থাকলে একটি শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা যে কত সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে তার প্রমাণ ঢাকার জলাবদ্ধতা। প্রশ্ন জাগে, পুরনো খালগুলো কেন সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না ? আবার কেন আমরা খাল ও নালাগুলোতে জেনেশুনে বর্জ্য ফেলছি? এসব কারণে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি নানা রকম নতুন নতুন রোগবালাইও দেখা দিচ্ছে।

 

খাল-নদী উদ্ধারে ২০১০ সালে  ছয়টি মন্ত্রণালয়কে নিয়ে  টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। এসব টাস্কফোর্স দায়সারাভাবে কাজ শেষ করেছে। ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে, ঘন্টায় সামান্য ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই শহরের প্রধান সড়ক তলিয়ে যাচ্ছে। তথ্যমতে, ১৯৭৮ সালে ঢাকায় নদী ও খালের আয়তন ছিল ২৯ বর্গকিলোমিটার। ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটারে। আবার ১৯৭৮ সালে নিম্ন ও  জলাভূমির আয়তন ছিল ১০৩ দশমিক ১৭ বর্গকিলোমিটার। ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ৩৩ বর্গকিলোমিটারে।  আর একটি কথা না বললেই নয়, রাজধানীকে আমরা উন্নয়নের নামে সবুজের বদলে কংক্রীটের শহর বানিয়ে ফেলেছি।  খোলা জমি কংক্রীটে ঢাকা পড়ায় নিচের মাটি পানি শোষণ করতে পারছে না।  নগরের উন্নয়ন কার্যক্রমে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রায় ৪৫টি সংস্থা কর্মরত।  কিন্তু এগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় আছে বলে মনে হয় না !  ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ও পানি নিষ্কাশনে ঢাকা ওয়াসার মূল ভূমিকা থাকলেও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার দায়িত্ব কোনো অংশে কম নয়।  তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন, বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ ও দক্ষতার অভাবে মূলত রাজধানীবাসীর এই ভোগান্তি।

 

তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে নাগরিক সচেতনতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও প্লাস্টিকের বোতলগুলো আমরা কোথায় ফেলছি? গৃহস্থালি বর্জ্য আমরা কোথায় ফেলছি? এ ব্যাপারে আমাদের ভাবতে হবে। ভাবতে কষ্ট লাগে, ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর জরিপে বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকা মহানগরী প্রথমসারিতেই স্থান করে নিয়েছে। এ দায় কার? জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা মাথায় নিয়ে এখন পরিকল্পনা করতে হবে। কেননা এখন ঘন ঘন বৃষ্টি হচ্ছে, অসময়ে বৃষ্টি হচ্ছে, আবার একটানা অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। এসব মাথায় নিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। ঢাকা শহরকে আধুনিক, বাসযোগ্য ও স্মার্ট রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এর অন্যান্য সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ও সমন্বিত দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায় নগরবাসী ।
লেখক: সাধন সরকার 
শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments
Share This Post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *